আমার সংবাদ ডেস্ক
মার্চ ৮, ২০২৬, ০৮:১৭ পিএম
২০২৬ সালের শুরু থেকেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার যে শঙ্কা দেখা দিয়েছিল, তার প্রভাব এবার সরাসরি পড়েছে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে। বৈশ্বিক এই সংকট মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আগামীকাল সোমবার থেকেই পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটি শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
রোববার রাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা এক জরুরি পত্রে এই নির্দেশনা জানানো হয়।
সাধারণত রমজানের মাঝামাঝি বা শেষ দিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছুটি শুরু হলেও এবার পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে বেশ আগেই এই ছুটির ঘণ্টা বাজানো হলো। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই ছুটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পূর্বনির্ধারিত শিক্ষাপঞ্জি অনুযায়ী ঈদের ছুটি শেষ হওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় স্বার্থে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একটি বিশাল কর্মযজ্ঞের কেন্দ্র। এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার এয়ার কন্ডিশনার, ফ্যান, লাইট এবং গবেষণাগারে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন যন্ত্রপাতির ব্যবহার হয়।
এছাড়া কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যাতায়াতে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ব্যয় হয়। মন্ত্রণালয়ের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ থাকলে জাতীয় গ্রিডে চাপ কমবে এবং আবাসিক হল ও প্রশাসনিক ভবনগুলোতে বিদ্যুতের চাহিদা শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। এর ফলে পরিবহন খাতে ব্যবহৃত ডিজেল ও পেট্রোলের খরচ এক ধাক্কায় অনেক কমে যাবে এবং দীর্ঘ মেয়াদে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে এটি একটি সাময়িক কিন্তু কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় কেবল ছুটি ঘোষণা করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যানকে পাঠানো চিঠিতে আগের ১১ দফা নির্দেশনা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ইতিপূর্বে যে নির্দেশনাবলী দেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের দাপ্তরিক কাজে গাড়ির ব্যবহার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা, সভা ও সেমিনার সশরীরে না করে অনলাইনে বা ভার্চুয়ালি সম্পন্ন করা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের তাপমাত্রা নির্দিষ্ট সীমার অর্থাৎ ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে না রাখা এবং দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাসহ অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ রাখা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই আদেশ দেশের সকল পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের অবহিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ইউজিসিকে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কেবল শিক্ষার্থীদের ছুটি নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যেও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী এবং দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। ছুটির সময়েও যে বিভাগগুলো জরুরি প্রয়োজনে খোলা থাকবে, সেখানে যেন কোনোভাবেই বিদ্যুতের অপচয় না হয় সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখতে বলা হয়েছে। হঠাৎ করে ছুটি এগিয়ে আসায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
অনেক শিক্ষার্থী সেশন জট বা ক্লাস মিস হওয়ার আশঙ্কা করলেও, জাতীয় এই সংকটকালে সরকারের সিদ্ধান্তকে অনেকে যৌক্তিক বলে মনে করছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আশ্বস্ত করেছে যে, এই ছুটির কারণে একাডেমিক ক্যালেন্ডারে যে ঘাটতি তৈরি হবে, তা পরবর্তীতে অতিরিক্ত ক্লাস বা অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে পুষিয়ে দেওয়া হবে।
২০২৬ সালের এই জ্বালানি সংকট কেবল বাংলাদেশের একক সমস্যা নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রাকৃতিক গ্যাস ও অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বের অনেক উন্নত দেশও বর্তমানে কৃচ্ছ্রসাধন নীতি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ সরকার আগেভাগেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ছুটির আওতায় এনে বড় ধরনের লোডশেডিং বা বিদ্যুৎ বিপর্যয় এড়ানোর চেষ্টা করছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ঈদের ছুটি যেখানে শেষ হওয়ার কথা, সেখানেই এই বর্ধিত ছুটির সমাপ্তি ঘটবে। তবে যদি বৈশ্বিক পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, তবে ছুটির মেয়াদ বৃদ্ধি বা বিকল্প পন্থায় যেমন পূর্ণাঙ্গ অনলাইন শিক্ষা পাঠদান চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের সাথে জড়িত। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলো যদি সাশ্রয়ের এই মিছিলে নেতৃত্ব দেয়, তবে তা সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও সচেতনতা তৈরি করবে।
আগাম এই ঈদের ছুটি কেবল শিক্ষার্থীদের বাড়ি ফেরার সুযোগ নয়, বরং দেশপ্রেমের এক বড় পরীক্ষা। আমরা যদি আজ সচেতনভাবে জ্বালানি সাশ্রয় না করি, তবে ভবিষ্যতের উজ্জ্বল আলো হয়তো অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যেতে পারে।
জেএইচআর