স্বাস্থ্য ডেস্ক
ডিসেম্বর ২৯, ২০২৫, ০৭:২৫ পিএম
প্যারালাইসিস বা পক্ষাঘাত একটি গুরুতর শারীরিক অবস্থা, যেখানে মানুষের শরীরের কোনো অংশ আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে নড়াচড়া করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। সাধারণত স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতির কারণে এই সমস্যা দেখা দেয়।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্যারালাইসিস সম্পর্কে বিস্তৃত গবেষণা হলেও এখনো এটি মানুষের জীবনে বড় ধরনের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সচেতনতার অভাব ও চিকিৎসা বিলম্বের কারণে অনেক রোগী স্থায়ী প্রতিবন্ধকতার শিকার হন।
প্যারালাইসিস বলতে শরীরের এক বা একাধিক অংশে পেশীর শক্তি হ্রাস বা সম্পূর্ণ শক্তিহীন হয়ে যাওয়াকে বোঝায়। এ অবস্থায় আক্রান্ত ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবে হাত, পা নড়াতে পারেন না, কখনো কথা বলা, গিলতে পারা বা মুখের অভিব্যক্তি নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
প্যারালাইসিস সাময়িকও হতে পারে আবার স্থায়ীও হতে পারে, এটি মূলত নির্ভর করে স্নায়ুর ক্ষতির মাত্রা ও চিকিৎসার সময়ের ওপর।
প্যারালাইসিস বিভিন্নভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা যায়। হেমিপ্লেজিয়া হলো শরীরের এক পাশ অর্থাৎ ডান বা বাম সম্পূর্ণভাবে অবশ হয়ে যাওয়া। সাধারণত স্ট্রোকের কারণে এই ধরনের প্যারালাইসিস হয়। প্যারাপ্লেজিয়া পদ্ধতিতে শরীরের নিচের অংশ অর্থাৎ দুই পা অবশ হয়ে যায়। এটি প্রায়ই মেরুদণ্ডের আঘাতের ফলে ঘটে। কোয়াড্রিপ্লেজিয়া পদ্ধতিতে শরীরের চারটি অঙ্গ অর্থাৎ দুই হাত ও দুই পা সবই অবশ হয়ে যায়। এটি মারাত্মক স্নায়ু বা মেরুদণ্ড ক্ষতির কারণে হয়। ফেসিয়াল প্যারালাইসিস পদ্ধতিতে মুখের পেশী অবশ হয়ে যায়, যেমন বেলস পালসি। এ ছাড়া রয়েছে টেম্পোরারি প্যারালাইসিস বা সাময়িক পক্ষাঘাত, যা নির্দিষ্ট সময় পরে সেরে যেতে পারে।
প্যারালাইসিসের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বন্ধ বা রক্তক্ষরণ হলে স্ট্রোক হয়, যা প্যারালাইসিসের সবচেয়ে সাধারণ কারণ। এ ছাড়া দুর্ঘটনা, পড়ে যাওয়া বা ভারী আঘাতে মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হলে পক্ষাঘাত দেখা দেয়। স্নায়ুজনিত রোগ যেমন গিলিয়ান, বারে সিনড্রোম ও মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস এর কারণ হতে পারে। সংক্রমণ যেমন পোলিও, মেনিনজাইটিস বা এনসেফালাইটিসের মতো রোগ স্নায়ুকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকলেও স্নায়ুর ক্ষতি হয়। পাশাপাশি কিছু বিষাক্ত রাসায়নিক বা অতিরিক্ত ওষুধ স্নায়ুর কার্যক্ষমতা নষ্ট করতে পারে।
প্যারালাইসিসের লক্ষণ রোগের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো হাত বা পা নড়াতে না পারা, শরীরের কোনো অংশে অনুভূতি কমে যাওয়া, মুখ বেঁকে যাওয়া, কথা বলতে অসুবিধা, ভারসাম্যহীনতা এবং পেশী শক্ত বা ঝুলে যাওয়া। হঠাৎ এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
প্যারালাইসিসের চিকিৎসা নির্ভর করে কারণ, ধরন ও রোগীর অবস্থার ওপর। সম্পূর্ণ নিরাময় সব ক্ষেত্রে সম্ভব না হলেও সঠিক চিকিৎসায় অনেক ক্ষেত্রে উন্নতি হয়। স্ট্রোকজনিত প্যারালাইসিস হলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ৩ থেকে ৪.৫ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা পেলে ক্ষতি অনেকাংশে কমানো যায়। ওষুধের ক্ষেত্রে রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধক, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ এবং স্নায়ু উদ্দীপক ও ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহৃত হয়।
ফিজিওথেরাপি এই চিকিৎসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিয়মিত ব্যায়াম ও থেরাপির মাধ্যমে পেশী শক্তিশালী করা যায় এবং চলাফেরার সক্ষমতা কিছুটা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। রোগীকে দৈনন্দিন কাজ যেমন খাওয়া, পোশাক পরা ও লেখার জন্য অকুপেশনাল থেরাপির মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যাদের কথা বলায় সমস্যা হয়, তাঁদের জন্য স্পিচ থেরাপি কার্যকর। কিছু ক্ষেত্রে মেরুদণ্ড বা স্নায়ুর ওপর চাপ কমাতে অস্ত্রোপচার বা সার্জারি করা হয়।
প্যারালাইসিস রোগীর জন্য চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক ও সামাজিক পুনর্বাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার ও সমাজের সহানুভূতিশীল আচরণ রোগীর আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। পুষ্টিকর খাদ্য, নিয়মিত থেরাপি ও ইতিবাচক মানসিকতা পুনরুদ্ধারে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান ও মাদক পরিহার করা, নিয়মিত ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা এবং দুর্ঘটনা এড়াতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করার মাধ্যমে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। প্যারালাইসিস একটি জটিল ও ভয়াবহ রোগ হলেও এটি সম্পর্কে সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসা নিলে অনেক ক্ষেত্রে রোগীর জীবনমান উন্নত করা সম্ভব।
আধুনিক চিকিৎসা, ফিজিওথেরাপি ও সামাজিক সহায়তার সমন্বয়ে প্যারালাইসিস আক্রান্ত ব্যক্তিরা নতুন করে স্বাভাবিক জীবনের দিকে ফিরে যেতে পারেন। তাই প্যারালাইসিসকে ভয় না পেয়ে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের দিকে গুরুত্ব দেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ইএইচ