আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মে ১৪, ২০২৬, ০৯:৩৯ এএম
দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর চরম স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অফ দ্য পিপল’-এ মুখোমুখি হলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রায় দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকটি ছিল গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনা।
বৈঠকের সূচনালগ্নে শি জিনপিং যেখানে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং অংশীদার’ হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন, সেখানে ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বের প্রশংসা করে দুই দেশের সম্পর্ককে ‘আগের চেয়েও শক্তিশালী’ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
তবে এই উষ্ণ বাক্যবিনিময়ের আড়ালে যে গভীর ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা কাজ করছে, তা চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত শি জিনপিংয়ের কড়া সতর্কবার্তায় স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে কোনো প্রকার ছাড় না দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
সম্পর্কের নতুন সংজ্ঞা: প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার
বৈঠকের শুরুতেই প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং অত্যন্ত সংযত এবং ইতিবাচক অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতিতে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত কোনো পক্ষকেই জয়ী করবে না। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমাদের উচিত একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে অংশীদার হিসেবে কাজ করা। শি’র এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, চীন বর্তমানে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী।
এর জবাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতেই শি জিনপিংকে একজন "মহান নেতা" হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, অতীতের তিক্ততা কাটিয়ে দুই দেশ এখন এমন এক উচ্চতায় পৌঁছাবে যা আগে কখনও দেখা যায়নি। ট্রাম্পের এই অবস্থান অনেক বিশেষজ্ঞকে অবাক করেছে, কারণ এর আগে তার নির্বাচনী প্রচারে তিনি চীনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা বলেছিলেন।
তাইওয়ান ইস্যু: চীনের লাল রেখা
বৈঠক শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম শি জিনপিংয়ের একটি মন্তব্য প্রকাশ করে, যেখানে সরাসরি তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। শি সতর্ক করে বলেন যে, তাইওয়ান ইস্যুতে মার্কিন হস্তক্ষেপ 'সংঘাতের' পথ তৈরি করতে পারে। চীন শুরু থেকেই তাইওয়ানকে তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের তাইওয়ানপন্থী নীতি বেইজিংয়ের জন্য সবসময়ই উদ্বেগের কারণ। এই সতর্কবার্তা এটিই প্রমাণ করে যে, বাণিজ্য ও প্রযুক্তিতে নমনীয় হওয়ার সুযোগ থাকলেও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে চীন এক চুলও ছাড় দেবে না।
ট্রাম্পের সাথে বেইজিংয়ে সিলিকন ভ্যালির মহারথীরা
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সফরে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল তার সাথে আসা প্রতিনিধি দল। ট্রাম্পের বিমানে সরাসরি বেইজিংয়ে নামেন টেসলা এবং স্পেসএক্সের প্রধান 'ইলন মাস্ক' এবং এনভিডিয়া (Nvidia)-র প্রধান 'জেনসেন হুয়াং।
প্রযুক্তি জগতের এই দুই প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বকে সাথে নিয়ে আসার পেছনে ট্রাম্পের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে। তিনি চান চীন যেন মার্কিন টেক কোম্পানিগুলোর জন্য তাদের বাজার পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেয়। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং চিপ শিল্পের লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র যেন কোনোভাবেই পিছিয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে চান ট্রাম্প। ইলন মাস্কের চীনে বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে, অন্যদিকে এনভিডিয়ার জন্য চীন একটি বড় বাজার। ট্রাম্পের এই ‘টেক-কূটনীতি’ বেইজিংয়ের ওপর চাপ সৃষ্টির এক নতুন কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আলোচনার টেবিলে প্রধান ইস্যুগুলো
দুই ঘণ্টার এই দীর্ঘ আলোচনায় মূলত চারটি বড় বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে:
শুল্ক এবং বাণিজ্য (Tariffs): ট্রাম্প প্রশাসন গত কয়েক বছরে চীনের ওপর যে কঠোর শুল্ক আরোপ করেছে, তা কমানোর দাবি জানিয়েছে বেইজিং। বিনিময়ে ট্রাম্প চাচ্ছেন চীন যেন আরও বেশি মার্কিন কৃষিপণ্য এবং শিল্পপণ্য আমদানি করে।
প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা: সেমিকন্ডাক্টর চিপ এবং এআই প্রযুক্তিতে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার যে লড়াই চলছে, তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের প্রযুক্তিগত উত্থানকে নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে, অন্যদিকে চীন একে তাদের উন্নয়নে বাধা হিসেবে দেখে।
ইরান যুদ্ধ: বর্তমানে চলমান মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে চীনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প চাইছেন চীন যেন ইরানকে সংযত করতে তাদের প্রভাব খাটায়।
জলবায়ু এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা: বিশ্বের দুই শীর্ষ দূষণকারী দেশ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে যৌথ পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়েও সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়েছে।
২০১৭ থেকে ২০২৬: বদলে যাওয়া চীন
২০১৭ সালে ট্রাম্প যখন প্রথমবার বেইজিং সফরে এসেছিলেন, তখনকার চীনের চেয়ে বর্তমানের চীন অনেক বেশি শক্তিশালী এবং আত্মবিশ্বাসী। আমাদের বেইজিং প্রতিনিধি জানাচ্ছেন, আজকের চীন নিজেকে কেবল একটি উদীয়মান শক্তি নয়, বরং একটি স্থিতিশীল ‘গ্লোবাল সুপারপাওয়ার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। চীনের অবকাঠামো, সামরিক শক্তি এবং গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আগের চেয়ে অনেক বেশি সুসংহত। এই শক্তিশালী চীনের সাথে ডিল করা ট্রাম্পের জন্য ২০১৭ সালের তুলনায় অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।
আগামীর পথ: শান্তি নাকি সমঝোতা?
বৈঠক শেষে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই না হলেও দুই দেশের নেতারাই আলোচনার পথ খোলা রাখার ব্যাপারে একমত হয়েছেন। ট্রাম্পের 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতি এবং শি জিনপিংয়ের 'চীনা স্বপ্ন' (Chinese Dream) পরস্পরবিরোধী হলেও, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি একে অপরের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে সংঘাত কারোরই কাম্য নয়।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, শি জিনপিংয়ের তাইওয়ান বিষয়ক হুঁশিয়ারি এবং ট্রাম্পের বাণিজ্যিক দাবিগুলো অদূর ভবিষ্যতে নতুন কোনো বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। বিশেষ করে এনভিডিয়া এবং টেসলার মতো কোম্পানিগুলো যদি চীনে আরও সুযোগ পায়, তবে মার্কিন রাজনীতিতে ট্রাম্পের বিরোধীরা একে কীভাবে নেবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।
বেইজিংয়ের এই দুই ঘণ্টার বৈঠক হয়তো রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান করবে না, তবে এটি নিশ্চিত করেছে যে দুই পরাশক্তি যুদ্ধের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের বিরোধ মিটিয়ে নিতে আগ্রহী। শি জিনপিংয়ের 'অংশীদারিত্ব' এবং ট্রাম্পের 'গর্বিত সম্পর্ক- এই দুই মন্ত্র যদি বাস্তবে কার্যকর হয়, তবে ২০২৬ সাল বিশ্ব ইতিহাসের জন্য এক অনন্য বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। কিন্তু পর্দার আড়ালে যে দাবার ঘুঁটি চালিত হচ্ছে, তাতে কে শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়, তা সময়ই বলে দেবে।
সূত্র: বিবিসি
এএন