আমার সংবাদ ডেস্ক
ডিসেম্বর ২, ২০২৫, ০৫:১৬ পিএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য তফসিল ঘোষণার মাত্র কয়েক দিন আগে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু দুজন তরুণ মুখ-অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এবং আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। দুজনই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়ে উঠে আসা নেতৃত্ব; পরে অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভার অংশ হন। এখন প্রশ্ন: তারা কি সরকারে দায়িত্ব রেখে যাবেন, নাকি পদত্যাগ করে সরাসরি নির্বাচনের মাঠে নামবেন?
সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, দুজনের অবস্থান এক নয়। আসিফ নিজের রাজনৈতিক ঠিকানা নির্ধারণের দ্বারপ্রান্তে; অন্যদিকে মাহফুজ এখনো সিদ্ধান্তের সীমানায় দাঁড়িয়ে। দুইজনের পৃথক পরিস্থিতি রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বেশ কিছুদিন ধরেই দুই উপদেষ্টাকে পদত্যাগের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সেপ্টেম্বরের মধ্যভাগে প্রথমবার বিষয়টি জানানো হয়। কিন্তু তখন তাঁরা সময় চান। পরে আরও কয়েকবার অনুরোধ করা হলেও স্পষ্ট সিদ্ধান্ত দেননি কেউই।
তবে আসিফ মাহমুদ ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের দাবি, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই তিনি উপদেষ্টা পরিষদ থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু মাহফুজ আলমের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। তাঁর পরিবার–পরিজন বলছেন, তিনি হয়তো শেষ পর্যন্ত সরকারেই থাকতে পারেন অবশ্য সে ক্ষেত্রে নির্বাচনে লড়বেন না। যদি ভোটে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন, তফসিলের আগেই পদত্যাগ করবেন সেটাই নিয়ম মেনে হওয়া উচিত।
ঢাকা–১০ (ধানমন্ডি, কলাবাগান, নিউমার্কেট, হাজারীবাগ) আসনকে ঘিরে আসিফ মাহমুদের রাজনৈতিক হিসাব–নিকাশ চলছে বেশ কিছুদিন। তিনি কুমিল্লার মুরাদনগর এলাকার ভোটার ছিলেন; ৯ নভেম্বর তিনি ঢাকা–১০ এ নিজের ভোটার হবার আবেদন করেন যা তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়।
তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল জানায়, আসিফ বেশ কিছুদিন ধরে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার পথ খোলা রেখেছেন। এমনকি বিএনপির জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন বা খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় দোয়া মাহফিলে তাঁর সমর্থকদের উপস্থিতি রাজনৈতিক মহলে আলোচনায় তোলপাড় ফেলে। অন্যদিকে এনসিপির ভেতরে তাঁর অসন্তুষ্ট অনুসারীদের প্রকাশ্য সমালোচনা তাঁকে দলটিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে তিনটি পথ উন্মুক্ত: বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া, অথবা অন্য কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সমঝোতা।
বিএনপি এখনো ঢাকা-১০ এ প্রার্থী ঘোষণা করেনি এটিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসিফের দিকেই তাকিয়ে থাকার ইঙ্গিত বহন করে। এনসিপির তৃতীয় জোট গঠনের প্রচেষ্টাও থমকে আছে; ফলে আসিফের পথ আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
আসিফের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি মন্তব্য দেননি। তাঁর ঘনিষ্ঠরা বলছে, বিএনপি বা আরেকটি শক্তির সঙ্গে সমঝোতা হতে পারে। আবার স্বতন্ত্রও হতে পারেন; কিন্তু এনসিপিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এখনো স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি। রোববার রাতে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি এখনো জানি না কোন সিদ্ধান্ত নেব।
এ বক্তব্যই রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা ব্যাখ্যার জন্ম দিচ্ছে। তাঁর নিজের এলাকা লক্ষ্মীপুর-১ আসনে (রামগঞ্জ) তাঁর প্রার্থিতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা আছে। এলাকায় তাঁর ভাই, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুব আলম সক্রিয় থাকায় জল্পনা আরও বাড়ে।
এ আসনে আরেক প্রার্থী বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম আগেই প্রচারণা শুরু করেছেন। ফলে এই আসনে সমীকরণ হবে বহুমাত্রিক মাহফুজ আলম আসবেন কি না সেটাই এখন দেখার বিষয়।
মাহবুব আলম জানিয়েছেন, মাহফুজ এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। পদত্যাগ করলে ভোট করবেন; না করলে দায়িত্বেই থাকবেন। তবে কোন দল থেকে নির্বাচন করবেন তা পরিবারের পক্ষ থেকেও স্পষ্ট নয়।
মাহফুজ ও আসিফ দুজনই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ মুখ ছিলেন, যে আন্দোলনের সহকর্মীরাই পরে এনসিপি গঠন করে। কিন্তু তাঁদের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা এখন ঝাপসা। সূত্র জানায়, এই দুই তরুণ নেতা চেয়েছিলেন বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা বা জোটে যেতে পারলে সবচেয়ে ভালো হতো। কিছু অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হলেও পরে বিষয়টি আর এগোয়নি।
এদিকে এনসিপি তৃতীয় একটি রাজনৈতিক জোট তৈরিতে ব্যস্ত যেখানে আছে এবি পার্টি, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, গণ অধিকার পরিষদ ও জেএসডি। কিন্তু আপ বাংলাদেশ প্ল্যাটফর্মকে জোটে রাখা নিয়ে এনসিপির আপত্তি এবং গণ অধিকার পরিষদের অভ্যন্তরীণ দ্বিধা এই দুই কারণে জোট গঠন স্থবির হয়ে আছে। ফলে নির্বাচনের আগে তরুণ দুই উপদেষ্টার জন্য জোটের সমীকরণ সহজ হচ্ছে না।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) আগেই জানিয়েছেন ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহেই তফসিল ঘোষণার সম্ভাবনা প্রবল। অর্থাৎ হাতে সময় আছে মাত্র কয়েকদিন। ফলে দুই তরুণ উপদেষ্টাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে: সরকারে থেকে দায়িত্ব পালন করবেন, নাকি সরাসরি ভোটের মাঠে নামবেন?
এই সিদ্ধান্ত শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত নয়, বরং নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব নিয়ে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক প্রত্যাশা, জোটের বিস্তৃত কৌশল, এবং নির্বাচনী সমীকরণ সবকিছুর ওপর প্রভাব ফেলবে তাঁদের সিদ্ধান্ত।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তরুণ দুই উপদেষ্টার অবস্থান বিশেষ প্রতীকী। তাদের সিদ্ধান্ত শুধু একটি আসন বা দলকে নয়, পুরো নির্বাচনী গতিপথকে প্রভাবিত করতে পারে বিশেষত এমন সময়ে, যখন সমঝোতা, জোট এবং নতুন শক্তিগুলোর উত্থান রাজনৈতিক পরিমণ্ডলকে প্রতিনিয়ত বদলে দিচ্ছে।
আরও বড় প্রশ্ন, তারা কি ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা ‘নতুন রাজনীতির’ ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন, নাকি পুরোনো রাজনীতির শক্তি সমীকরণের অংশ হবেন?
সবার দৃষ্টি এখন তাদের সিদ্ধান্তের দিকে। সময়সীমা খুব কম আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই রাজনৈতিক অঙ্গন এর উত্তর পাবে।
জেএইচআর