ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

পিএসসির আমূল পরিবর্তন: ‘ওয়ান ইয়ার বিসিএস’ রোডম্যাপ ও চ্যালেঞ্জ

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

মে ১০, ২০২৬, ০১:৩৯ পিএম

পিএসসির আমূল পরিবর্তন: ‘ওয়ান ইয়ার বিসিএস’ রোডম্যাপ ও চ্যালেঞ্জ

সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) বর্তমানে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘদিনের দীর্ঘসূত্রতা, নিয়োগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বেড়াজাল ছিন্ন করে একটি গতিশীল ও স্বচ্ছ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের পুনর্গঠনের পরীক্ষায় নেমেছে কমিশন। 

বিশেষ করে ‘ওয়ান বিসিএস, ওয়ান ইয়ার’ বা এক বছরের মধ্যে একটি বিসিএস শেষ করার যে উচ্চাকাঙ্ক্ষী রোডম্যাপ বর্তমান কমিশন হাতে নিয়েছে, তা চাকরিপ্রার্থীদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে এই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্থায়ী সংস্কার, নন-ক্যাডার জটিলতা নিরসন এবং প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করাই এখন পিএসসির জন্য সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা।

বিগত এক দশকে বিসিএস পরীক্ষার ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে যে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যেত, তা বর্তমান কমিশনের অধীনে আমূল বদলে গেছে। ২০১৯ সালের ৪০তম বিসিএস কিংবা ২০২১ সালের ৪৩তম বিসিএসের প্রিলিমিনারির ফল প্রকাশ করতে যেখানে ৮০ থেকে ১০০ দিন সময় লেগেছিল, সেখানে ৪৭তম বিসিএসে বর্তমান কমিশন ফল প্রকাশ করেছে মাত্র ৯ দিনে।

সর্বশেষ ৫০তম বিসিএস প্রিলিমিনারির ফলও ১১ দিনের মাথায় প্রকাশ করে পিএসসি প্রমাণ করেছে যে, সদিচ্ছা থাকলে প্রযুক্তির সহায়তায় এই বিশাল কর্মযজ্ঞ অত্যন্ত দ্রুত সময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব।

এই গতির রহস্য কেবল দ্রুত ডাটা এন্ট্রি নয়, বরং পুরো প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন। পিএসসি সদস্য অধ্যাপক ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস জানান, লিখিত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে ‘সার্কুলার ইভাল্যুশন সিস্টেম’ চালু করা হয়েছে। আগে যেখানে খাতা দেখতে এক বছরের বেশি সময় লাগত, এখন তা মাত্র তিন মাসে নেমে এসেছে। 

উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যাতে পরীক্ষকদের মধ্যে কোনো বৈষম্য না থাকে, সে জন্য বিশেষজ্ঞরা প্রতিটি প্রশ্নের একটি ‘স্ট্যান্ডার্ড অ্যানসার’ বা মানসম্মত উত্তর নির্ধারণ করে দিচ্ছেন। এর ফলে মেধার প্রকৃত প্রতিফলন ঘটছে এবং বৈষম্যের সুযোগ কমছে।

চাকরিপ্রার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল বিসিএসের উচ্চ আবেদন ফি কমানো এবং মৌখিক পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে বৈষম্য হ্রাস করা। বর্তমান কমিশন এই দুটি ক্ষেত্রেই সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ৭০০ টাকার আবেদন ফি কমিয়ে ২০০ টাকা করা হয়েছে, যা প্রান্তিক ও অসচ্ছল মেধাবীদের জন্য বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

অন্যদিকে, মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২০০ থেকে কমিয়ে ১০০ করার সিদ্ধান্তটি প্রশাসনিক সংস্কারের একটি বড় ধাপ। এর ফলে ভাইভা বোর্ডে কোনো প্রার্থীর প্রতি পক্ষপাতিত্বের সুযোগ যেমন কমবে, তেমনি ক্যাডার নির্বাচনে লিখিত পরীক্ষার নম্বরের গুরুত্ব বাড়বে। পিএসসি এখন কেবল সাধারণ জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং ‘কম্পিটেন্সি বেজড ইন্টারভিউ’ বা যোগ্যতাভিত্তিক সাক্ষাৎকার পদ্ধতির মাধ্যমে সিভিল সার্ভিসের জন্য যোগ্য নেতৃত্ব খুঁজে বের করার কাজ করছে।

পিএসসির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বুয়েটের কারিগরি সহায়তায় একটি সমন্বিত সফটওয়্যার তৈরি করা হচ্ছে। এর আওতায় প্রতিটি প্রার্থীর জন্য থাকবে একটি ‘ইউনিক আইডি’। এই আইডি থাকলে একজন প্রার্থীকে বারবার তার ব্যক্তিগত ও একাডেমিক তথ্য আপলোড করতে হবে না। এ ছাড়া প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তায় আধুনিক বারকোড এবং ভাইভা বোর্ডে লটারি পদ্ধতি চালুর ফলে দুর্নীতির পথগুলো বন্ধ করার চেষ্টা চলছে।

একই সঙ্গে যুগের চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে বিসিএসের সিলেবাস পরিবর্তনের কাজও দ্রুত এগোচ্ছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তায় পুরোনো সিলেবাসকে আধুনিকায়ন করার কাজ ইতিমধ্যে অর্ধেক সম্পন্ন হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন গড়ে তোলা।

পিএসসির এই অগ্রযাত্রার মধ্যেও অস্বস্তির নাম ‘নন-ক্যাডার নিয়োগ’। ৪৩ ও ৪৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়েও কয়েক হাজার প্রার্থী এখনো নিয়োগের অপেক্ষায় রাজপথে আন্দোলন করছেন। সরকারি তথ্যমতে, বিভিন্ন দপ্তরে ৪ লাখ ৬৮ হাজারের বেশি পদ শূন্য থাকলেও পিএসসি কেন দ্রুত সুপারিশ করছে না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। 

যদিও জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী আশ্বাস দিয়েছেন যে, সব মন্ত্রণালয় থেকে শূন্য পদের তালিকা চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং নন-ক্যাডার থেকে সর্বোচ্চ নিয়োগের বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।

অন্যদিকে, নিয়োগের চূড়ান্ত ধাপে ‘পুলিশ ভেরিফিকেশন’ নিয়ে জটিলতা এখনো কাটেনি। রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে মেধাবীদের বাদ পড়ার সংস্কৃতি দূর করা বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় নৈতিক চ্যালেঞ্জ। রাজশাহী ও চট্টগ্রামের একাধিক প্রার্থীর উদাহরণ তুলে ধরে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেরিফিকেশন প্রথাকে কেবল অপরাধমূলক রেকর্ডে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত, রাজনৈতিক প্রভাবে নয়।

পিএসসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমের মতে, কমিশনের সাফল্যের স্থায়িত্ব নির্ভর করছে এর আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার ওপর। ২০১১ সালের পর থেকে পিএসসি কার্যত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি দপ্তরের মতো কাজ করছে।

নির্বাচন কমিশনের মতো বিধি প্রণয়ন বা নিজস্ব বাজেট ব্যয় করার ক্ষমতা পিএসসির হাতে নেই। চেয়ারম্যান স্পষ্ট করে বলেছেন, পিএসসিকে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ আশ্বস্ত করেছেন যে, সরকার পিএসসিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে না এবং এর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ-র অধ্যাপক রিদওয়ানুল হকের মতে, পিএসসিতে কেবল গতির সঞ্চার করলেই হবে না, বরং প্রার্থীদের মানসিক ও নৈতিক সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য ‘সাইকোমেট্রিক টেস্ট’ ও ‘ডিওবি টেস্টিং’-এর মতো উন্নত বিশ্বের পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন।

পরিশেষে বলা যায়, গত ১৮ মাসে পিএসসি যে অভাবনীয় পরিবর্তনের সূচনা করেছে, তা ধরে রাখাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। যদি ‘ওয়ান বিসিএস, ওয়ান ইয়ার’ মডেল সফল হয় এবং নিয়োগের প্রতিটি স্তরে শতভাগ স্বচ্ছতা ও নির্দলীয় ভেরিফিকেশন নিশ্চিত করা যায়, তবেই সিভিল সার্ভিস নিয়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হারানো আস্থা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হবে। 

বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর সংস্কারে পিএসসির এই ‘রেনেসাঁ’ যেন কোনো রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তে হারিয়ে না যায়, এটাই এখন সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা।

এএন

Link copied!