ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬
পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে নতুন নেতৃত্ব

শান্তিচুক্তি কি লঙ্ঘিত নাকি সময়োপযোগী রাজনৈতিক প্রজ্ঞা?

গোলাম যাকারিয়া, সাংবাদিক

গোলাম যাকারিয়া, সাংবাদিক

ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২৬, ০৩:৪৪ পিএম

শান্তিচুক্তি কি লঙ্ঘিত নাকি সময়োপযোগী রাজনৈতিক প্রজ্ঞা?

পার্বত্য চট্টগ্রাম- বাংলাদেশের এক অবিচ্ছেদ্য এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। দীর্ঘ দুই দশকের সশস্ত্র সংঘাতের পর ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত হয়েছিল ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি। সেই চুক্তির প্রেক্ষাপটে ১৯৯৮ সালে গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকারে এই মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে যে বিন্যাস দেখা গেছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পাহাড়ের চাকমা জাতিসত্তার দীপেন দেওয়ানকে পূর্ণ মন্ত্রী এবং চট্টগ্রামের মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চুক্তিকারী পক্ষ এবং কিছু বিশ্লেষক একে ‘চুক্তির লঙ্ঘন’ হিসেবে দেখলেও, গভীর রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়- এই সিদ্ধান্তটি আসলে পাহাড়ের দীর্ঘস্থায়ী সংকট সমাধানে এক যুগান্তকারী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ।

সমালোচকরা চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ১৯ ধারার দোহাই দিয়ে বলছেন, সেখানে ‘উপজাতীয়দের মধ্য হইতে একজন মন্ত্রী’ নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আইনগতভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমান মন্ত্রিসভা এই শর্তটি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। দীপেন দেওয়ান একজন উপজাতীয় এবং তিনি পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। চুক্তিতে কোথাও বলা নেই যে, এই মন্ত্রণালয়ে কোনো ‘প্রতিমন্ত্রী’ থাকতে পারবে না বা থাকলে তাঁকে উপজাতীয় হতে হবে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৬ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা এবং দপ্তর বণ্টনের পূর্ণ এখতিয়ার রাখেন। পার্বত্য চুক্তিটি সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়, বরং সংবিধানের কাঠামোর ভেতরেই একটি বিশেষ সমঝোতা। সুতরাং, পূর্ণ মন্ত্রী পদে উপজাতীয় প্রতিনিধি রেখে সহযোগী হিসেবে একজন দক্ষ প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ করা কোনোভাবেই চুক্তির বরখেলাপ নয়। বরং এটি চুক্তির মূল চেতনাকে সমুন্নত রেখেই প্রশাসনিক গতিশীলতা আনার একটি প্রয়াস।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাগুলো যেমন স্থানীয়, তেমনি এর প্রভাব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক। দীর্ঘ ২৮ বছরেও পাহাড়ের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া এবং পাহাড়ে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তারের লড়াই প্রমাণ করে যে, কেবল একমুখী নেতৃত্বে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

মন্ত্রণালয়ে এখন আমরা একটি ‘দ্বিমুখী দক্ষতা’র সমন্বয় দেখছি। একদিকে পূর্ণ মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান পাহাড়ের নাড়ি-নক্ষত্র চেনেন, তিনি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। অন্যদিকে, প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন চট্টগ্রামের একজন প্রভাবশালী এবং সুশিক্ষিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। পাহাড়ের সীমান্ত নিরাপত্তা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং জাতীয় নীতিনির্ধারণী মহলে পাহাড়ের দাবিগুলো জোরালোভাবে তুলে ধরার জন্য তার মতো একজন নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল। এই ‘পাহাড়ি-বাঙালি’ নেতৃত্বের মেলবন্ধন পাহাড়ের প্রশাসনিক জটিলতা কাটাতে এক নতুন মাত্রার যোগ করবে।

বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্টভাবেই বলেছিল যে তারা পার্বত্য শান্তিচুক্তির ‘পুনর্মূল্যায়ন’ করবে। পুনর্মূল্যায়ন মানে চুক্তি বাতিল করা নয়, বরং চুক্তির যে ধারাগুলো বাস্তবায়নে গত তিন দশকে বাধা সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলো দূর করা।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে ৫২ শতাংশ বাঙালি জনসংখ্যার বসবাস। শান্তিচুক্তির অনেক ক্ষেত্রে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বার্থ উপেক্ষিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মীর হেলাল উদ্দিনের মতো একজন অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের মাধ্যমে সরকার আসলে পাহাড়ে বসবাসরত সকল নাগরিকের মধ্যে একটি আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে। শান্তিচুক্তির বাস্তবায়নে এখন একটি ‘সমন্বিত তদারকি’ সম্ভব হবে। প্রতিমন্ত্রী পাহাড়ের বাইরের ও ভেতরের স্বার্থগুলোর মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করতে পারবেন, যা আগে কখনও সম্ভব হয়নি।

পাহাড়ের সমস্যা যতটা না প্রশাসনিক, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্ভবত এটি অনুধাবন করেছেন যে, পাহাড়ের সংঘাত কেবল আমলাতান্ত্রিক ফাইল চালাচালি দিয়ে বন্ধ হবে না। এর জন্য প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি।

এর আগে আমরা দেখেছি, শুধুমাত্র পাহাড়ি প্রতিনিধিরা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকায় অনেক সময় জাতীয় স্বার্থ বা পাহাড়ের বাঙালিদের দাবিগুলো যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। আবার সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমেও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আসেনি। প্রধানমন্ত্রী এবার ‘ইনক্লুসিভ পলিসি’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণ করেছেন। একজন বাঙালি প্রতিমন্ত্রীকে এই মন্ত্রণালয়ে যুক্ত করে তিনি বার্তা দিয়েছেন যে- পাহাড় কেবল নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর নয়, পাহাড় সমগ্র বাংলাদেশের। আর পাহাড়ের সমস্যা সমাধানে পুরো দেশের রাজনৈতিক শক্তিকে সম্পৃক্ত হতে হবে। এটি প্রধানমন্ত্রীর একটি অত্যন্ত সাহসী এবং সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

পার্বত্য চুক্তিতে পাহাড়কে ‘উপজাতীয় অধ্যুষিত’ অঞ্চল বলা হলেও বর্তমান বাস্তবতায় সেখানে অর্ধেকের বেশি বাঙালি। দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত দূর করতে হলে অ-বাঙালি ও বাঙালিদের মধ্যে ‘সম্প্রীতি’ এবং ‘সমঅধিকার’ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

মন্ত্রণালয়ের এই নতুন বিন্যাস পাহাড়ের বাঙালিদের মনে এই বিশ্বাস জোগাবে যে, সরকার তাদের কথা ভাবছে। অন্যদিকে উপজাতীয়রা একজন পূর্ণ মন্ত্রী পাওয়ায় তাদের অধিকারও সংরক্ষিত থাকছে। এটি একটি ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি। যখন মন্ত্রণালয়ের দুই শীর্ষ ব্যক্তি দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে আসবেন, তখন যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা বজায় থাকবে। এতে করে ভূমি কমিশনের কাজ আরও গতিশীল হবে এবং দীর্ঘদিনের ভূমি বিরোধ নিরসনে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বেরিয়ে আসবে।

জেএসএস বা আঞ্চলিক দলগুলো যে ক্ষোভ প্রকাশ করছে, তা মূলত তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য হারানোর ভয় থেকে উদ্ভূত। কিন্তু একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো বিশেষ অঞ্চলকে কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত রাখা এবং বাকিদের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা সমঅধিকারের পরিপন্থী।

আমরা যদি উন্নত বিশ্বের দিকে তাকাই, তবে দেখব সেখানে জাতিগত সমস্যা সমাধানে সবসময় ‘শেয়ার্ড পাওয়ার’ বা ক্ষমতার ভাগাভাগিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী ঠিক সেই আধুনিক পথেই হাঁটছেন। মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের মতো তরুণ ও মেধাবী নেতাকে এই গুরুদায়িত্ব দেওয়া প্রমাণ করে যে, সরকার পাহাড়ের উন্নয়ন ও শান্তিকে কেবল রুটিন কাজ হিসেবে দেখছে না, বরং একে একটি অগ্রাধিকারমূলক প্রজেক্ট হিসেবে নিয়েছে।

 নতুন সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একজন বাঙালি প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ নিয়ে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, তা মূলত শান্তিচুক্তির আক্ষরিক ব্যাখ্যা এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যকার একটি তফাত। তবে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই নিয়োগ শান্তিচুক্তির কোনো ধারাকে লঙ্ঘন করেনি, বরং এটি পাহাড়ের স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এটি একটি সুচিন্তিত রাজনৈতিক কৌশল। এটি শান্তিচুক্তির মূল ভিত্তিকে আঘাত করে না, বরং চুক্তির লক্ষ্য- অর্থাৎ পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনা- সেই লক্ষ্য অর্জনকে আরও সহজতর করে।

সংকট মোকাবিলায় দ্বিমুখী দক্ষতার ব্যবহার, শান্তিচুক্তির বাস্তবায়নে সমন্বিত তদারকি এবং পাহাড়ি-বাঙালি ভেদাভেদ ভুলে একটি জাতীয় ঐক্যের ডাক দেওয়ার জন্য নতুন প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। পাহাড়ে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দিতে হলে আমাদের পুরোনো সংকীর্ণতা কাটিয়ে উঠতে হবে। এই নতুন নেতৃত্বই হতে পারে সেই পরিবর্তনের কান্ডারি। আমরা আশা করি, দীপেন দেওয়ান এবং মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের যৌথ নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি আধুনিক, শান্তিপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ জনপদে পরিণত হবে।

এএন

Link copied!