আমার সংবাদ ডেস্ক
এপ্রিল ২৮, ২০২৬, ০৫:৩২ পিএম
বাংলাদেশ বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের এক ভয়াবহ রূপ প্রত্যক্ষ করছে। কয়েক বছর আগেও কালবৈশাখীর বিকেলে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি মানেই ছিল মনে এক চিলতে প্রশান্তি। কিন্তু এখন বৃষ্টির শব্দের সাথে সাথে আকাশ চিরে আসা বিদ্যুতের ঝলকানি মানুষের মনে ত্রাস সৃষ্টি করছে। দেশে বর্তমানে প্রাকৃতিক দুর্যোগের তালিকায় অন্যতম শীর্ষে উঠে এসেছে বজ্রপাত।
প্রতি বছর বজ্রপাতে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা আগের বছরের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কেন হঠাৎ করে এই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে এবং এর থেকে পরিত্রাণের পথই বা কী, তা নিয়ে গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।
বজ্রপাতে মৃত্যু কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা নয়, এর পেছনে রয়েছে পরিবেশগত পরিবর্তন ও সচেতনতার অভাব। উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো:
বনভূমি উজাড় ও তালগাছের অভাব: গ্রামাঞ্চলে আগে প্রচুর পরিমাণে উঁচু গাছ, বিশেষ করে তালগাছ ও সুপারি গাছ থাকত। উচ্চতার কারণে বজ্রপাত সরাসরি এই গাছগুলোতে পড়ত এবং ভূ-সংযোগের মাধ্যমে তা সরাসরি মাটিতে চলে যেত। ফলে মানুষ ও গবাদি পশু নিরাপদ থাকত। বর্তমানে গাছ কাটার মহোৎসবে প্রকৃতি তার এই সুরক্ষাকবচ হারিয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন: বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বজ্রপাতের আশঙ্কা প্রায় ১২ শতাংশ বেড়ে যায়। বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালে তীব্র দাবদাহের পর যখন হঠাত বৃষ্টির মেঘ জমে, তখন বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়, যা শক্তিশালী বজ্রপাতের জন্ম দেয়।
খোলা মাঠে কাজ ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার: আমাদের দেশে অধিকাংশ বজ্রপাত ঘটে কৃষি মৌসুমে তথা মার্চ থেকে জুন মাসে। কৃষকরা যখন খোলা মাঠে কাজ করেন, তখন তারা বজ্রপাতের জন্য সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন। এছাড়া হাতে থাকা ধাতব কাস্তে, কোদাল বা পকেটে থাকা মোবাইল ফোনের ইলেকট্রনিক তরঙ্গ বজ্রকে আকর্ষণ করার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
সচেতনতার চরম অভাব: এখনও গ্রামাঞ্চলের অনেক মানুষ মনে করেন বজ্রপাত একটি দৈব ঘটনা যার ওপর মানুষের হাত নেই। মেঘ ডাকলে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পরিবর্তে অনেকে খোলা জায়গায় চলাচল করেন বা পুকুরে গোসল করেন, যা মৃত্যুর ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
বজ্রপাতকে থামানোর কোনো উপায় মানুষের হাতে নেই, তবে কিছু পরিকল্পিত পদক্ষেপের মাধ্যমে মৃত্যুহার শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব।
প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান: সরকার ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সারাদেশে ব্যাপকভাবে তালগাছ ও বটগাছ রোপণ করতে হবে। উঁচু গাছগুলো বজ্রপাতকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে বজ্র-নিরোধক হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে ফসলি মাঠের পাশে ও রাস্তার ধারে এই উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।
প্রযুক্তিগত সমাধান: আধুনিক প্রযুক্তির বজ্র-সংগ্রাহক বা বজ্র-নিরোধক দণ্ড জনবহুল এলাকা, বিশেষ করে স্কুল-কলেজ ও খোলা মাঠের নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর স্থাপন করতে হবে। এটি বজ্রপাতকে নিরাপদে মাটিতে প্রবাহিত করে দেয়। পাশাপাশি মোবাইল অ্যাপ বা সাইরেনের মাধ্যমে ঝড়ের অন্তত ১৫ থেকে ৩০ মিনিট আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষকে সতর্ক করার আগাম বার্তা প্রদানের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
অবকাঠামোগত পরিবর্তন: নতুন বাড়ি বা ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ভূ-সংযোগ বা আর্থিং ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে। গ্রামীণ এলাকায় খোলা মাঠে কৃষকদের জন্য ছোট ছোট বজ্রপাত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা প্রয়োজন, যেখানে বজ্রপাতের সংকেত পেলে দ্রুত আশ্রয় নেওয়া যায়।
বজ্রপাত থেকে বাঁচতে হলে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিছু নিয়ম মেনে চলা জীবন ও মৃত্যুর পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। যদি খোলা মাঠে থাকেন, তবে দ্রুত কোনো পাকা দালানের নিচে আশ্রয় নিন। আশেপাশে কোনো উঁচু গাছ থাকলে তার নিচে দাঁড়াবেন না। যদি আশেপাশে কোনো আশ্রয় না থাকে, তবে কানে হাত দিয়ে উবু হয়ে বসে পড়ুন। পায়ের গোড়ালি দুটি একে অপরের সাথে লাগিয়ে রাখুন কিন্তু মাটিতে শুয়ে পড়বেন না।
বাড়িতে থাকলে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করুন, জানালার পাশে দাঁড়াবেন না এবং পানির কল স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন। আবার গাড়িতে থাকলে জানালার কাঁচ বন্ধ করে ভিতরেই থাকুন এবং ধাতব অংশ স্পর্শ করবেন না।
বজ্রপাতকে এখন বাংলাদেশ সরকার জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে। তবে কেবল ঘোষণা নয়, এর সঠিক বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রকৃতি যখন রুষ্ট হয়, তখন মানুষের তৈরি আধুনিক সভ্যতা অসহায় হয়ে পড়ে। তাই একদিকে যেমন প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধন করতে হবে, তেমনি অন্যদিকে প্রকৃতিকে তার পুরনো রূপ ফিরিয়ে দিতে প্রচুর গাছ লাগাতে হবে।
সবচেয়ে বড় সমাধান হলো জনসচেতনতা। পাঠ্যপুস্তকে বজ্রপাত থেকে বাঁচার উপায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং গ্রামগঞ্জে ইউনিয়ন পর্যায়ে উঠান বৈঠকের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করতে পারলে এই নীরব ঘাতকের হাত থেকে বহু প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। বজ্রপাত কোনো অভিশাপ নয়, এটি একটি প্রাকৃতিক ঘটনা যাকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে মোকাবিলা করাই হলো বুদ্ধিমানের কাজ।
জেএইচআর