আমার সংবাদ ধর্ম ডেস্ক
এপ্রিল ৪, ২০২৬, ০২:২৬ পিএম
আমাদের সমাজব্যবস্থায় ধর্মীয় অনুশাসনের চেয়ে অনেক সময় লোকজ প্রথা বা বংশপরম্পরায় চলে আসা কুসংস্কারের প্রভাব বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে নারীদের সাজসজ্জা, অলংকার পরিধান এবং বৈবাহিক জীবনের বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে এমন কিছু ধারণা প্রচলিত আছে, যার কোনো ভিত্তি পবিত্র কোরআন বা হাদিসে নেই।
এমনই একটি বহুল প্রচলিত প্রশ্ন হলো, বিবাহিত মেয়েরা চুড়ি বা নাকফুল না পরলে কি স্বামীর অমঙ্গল হয় কিংবা স্বামীর হায়াত কমে যায়? সামাজিক এই ব্যাধি ও ভ্রান্ত ধারণার অপনোদন ঘটিয়ে ইসলামি শরিয়তের প্রকৃত অবস্থান তুলে ধরা এখন সময়ের দাবি।
ইসলামি পরিভাষায় যেসব বিশ্বাস বা কাজের ভিত্তি শরিয়তে নেই, বরং নিছক লোকজ প্রথা বা অমূলক ভয়ের ওপর ভিত্তি করে লালন করা হয়, তাকেই কুসংস্কার বলা হয়। এটি কেবল ধর্মীয় বিচ্যুতি নয়, বরং সুস্থ সমাজ ও সভ্যতার পথে এক বড় বাধা। ইসলাম সবসময় যুক্তি ও দালিলিক প্রমাণের ওপর গুরুত্বারোপ করে। তাই যে কোনো কাজ করার আগে বা কোনো বিষয় বিশ্বাস করার আগে তার শরিয়তসম্মত ভিত্তি যাচাই করা প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব।
অনেকের মনেই এই ভ্রান্ত ধারণা গেঁথে আছে যে, বিয়ের পর স্ত্রী যদি হাত খালি রাখে বা চুড়ি না পরে কিংবা নাকফুল না পরে, তবে তা স্বামীর অমঙ্গল বয়ে আনে। এমনকি অনেকে মনে করেন, এর ফলে স্বামীর আয়ু বা হায়াত কমে যেতে পারে। ফুকাহায়ে কেরাম ও আলেমদের অভিমত অনুযায়ী, ফাতাওয়া ও ফিকহ শাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহের আলোকে এই ধারণাকে সম্পূর্ণ মনগড়া, ভিত্তিহীন এবং কুসংস্কার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, মানুষের জন্ম, মৃত্যু এবং হায়াত একমাত্র মহান আল্লাহ তাআলার হাতে। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে যে, প্রত্যেক প্রাণীর মৃত্যুর সময় সুনির্ধারিত। আল্লাহর হুকুম ছাড়া কারো হায়াত এক মুহূর্ত কমবেও না, আবার বাড়বেও না। তাই স্ত্রীর অলংকার পরিধানের সাথে স্বামীর জীবনের দৈর্ঘ্যের কোনো সম্পর্ক থাকা অসম্ভব।
এ ধরনের ধারণা বিশ্বাস করা ইমানের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তথ্যসূত্র হিসেবে আদ দুররুল মুখতার মাআ শামি ৯ অবলিক ৬০২ এবং ফাতওয়া হিন্দিয়া ৫ অবলিক ৩৫৭ এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসলাম নারীদের সৌন্দর্য চর্চায় বাধা দেয় না, বরং স্বামীর সামনে নিজেকে সুসজ্জিত রাখা প্রশংসনীয়। অলংকার পরিধানের উদ্দেশ্যে নারীদের নাক বা কান ফোঁড়ানো ইসলামি শরিয়তে সম্পূর্ণ জায়েজ বা বৈধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে নারী সাহাবিরা অলংকার পরিধান করতেন বলে বিভিন্ন সহিহ হাদিসে প্রমাণ পাওয়া যায়।
প্রখ্যাত সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিন বের হলেন এবং দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন। এরপর তিনি বিলাল রাদিআল্লাহু আনহু কে সাথে নিয়ে নারীদের কাছে গেলেন এবং তাদের উপদেশ দিলেন ও সদকা করার নির্দেশ দিলেন। তখন উপস্থিত নারীরা তাদের কানের দুল এবং হাতের কঙ্কণ বা চুড়ি খুলে দান করতে শুরু করলেন।
সহিহ বুখারি ১৪৩১ নম্বর এই হাদিসটি স্পষ্ট করে দেয় যে, তৎকালীন নারী সাহাবিদের কানে ও হাতে অলংকার ছিল এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা দেখে নিষেধ করেননি। এর মাধ্যমেই নারীদের নাক কান ফোঁড়ানো এবং অলংকার ব্যবহারের বৈধতা প্রমাণিত হয়।
ইসলামি শরিয়তে নাক কান ফোঁড়ানো একটি অনুমোদিত বিষয়, কিন্তু এটি কোনো বাধ্যতামূলক ইবাদত নয়। কোনো হাদিসে যেমন এটি করতে সরাসরি নির্দেশ দেওয়া হয়নি, তেমনি নিষেধাজ্ঞাও প্রদান করা হয়নি। বিষয়টি মূলত ব্যক্তিগত অভিরুচির ওপর নির্ভরশীল।
কেউ চাইলে শুধু কান ফোঁড়াতে পারে, কেউ চাইলে শুধু নাক ফোঁড়াতে পারে, আবার কেউ চাইলে উভয়টি করতে পারে অথবা কোনোটিই না করে থাকতে পারে। স্ত্রী অলংকার না পরলে বা নাক কান না ফোঁড়ালে গুনাহ হবে, এমন ধারণা রাখা সম্পূর্ণ ভুল। অলংকার পরা সাজসজ্জার অংশ হতে পারে, কিন্তু এটি পরার ওপর স্বামীর ভাগ্য বা হায়াত নির্ভর করে না।
পরিশেষে বলা যায়, অলংকার বা চুড়ি নাকফুল না পরলে স্বামীর অমঙ্গল হওয়ার ধারণাটি একটি সামাজিক কুসংস্কার বৈ আর কিছু নয়। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে তাকদিরে বিশ্বাস করতে। স্বামীর কল্যাণ বা হায়াত নির্ভর করে মহান আল্লাহর রহমত এবং নেক আমলের ওপর, স্ত্রীর হাতের চুড়ির ওপর নয়।
একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো সমাজ থেকে এ জাতীয় ভ্রান্ত বিশ্বাস দূর করা। সাজসজ্জা হবে কেবল নিজের রুচি ও স্বামীর সন্তুষ্টির জন্য, কোনো অমূলক ভয়ের বশবর্তী হয়ে নয়। সঠিক জ্ঞান অর্জন এবং শরিয়তের সঠিক প্রয়োগই পারে আমাদের সমাজকে এসব অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রথা থেকে মুক্ত করতে।
জেএইচআর