নিজস্ব প্রতিবেদক
ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬, ১২:০৪ এএম
সম্প্রতি রাজধানী ঢাকা মশার তীব্র উপদ্রবের কবলে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে থাকা এবং গরম-আবহাওয়ার কারণে মশার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণ মানুষ দিনরাত মশার কামড় ও ঝঞ্ঝাটের হাত থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এ সময়ে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
বাসার ভেতর থেকে বাহির প্রতিটি জায়গাতেই মশার উপদ্রব বেড়ে গেছে, ঘরবাড়িতে মশাল জ্বালাতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো বলছে, গত মাসজুড়ে ও এই মাসের শুরু থেকেই মশার উপদ্রব অহরহ বেড়েই চলেছে।
মশার উৎপাত বেড়েই চলছে : মশার সংখ্যা এমনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যে অনেক বাসিন্দা দাবি করছে কখনো কখনো ‘মশার ঢেউ এত ঘন যে মনে হয় তারা বাতাসের চেয়ে ঘন।’ সম্প্রতি বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় রাতে ঘুমানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। বাসার দরজা ও জানালা বন্ধ রাখলেও মশা ভিতরে ঢুকে পড়ছে এবং মশাল জ্বালিয়ে থাকাই এখন প্রায় সাধারণ রুটিনের অংশ। বাসিন্দারা বলছেন, ঘরে থাকা অবস্থায়ও তারা মশার কামড় থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না। মশারি টানিয়ে সুরক্ষা নেয়ার চেষ্টা করা হলেও তা সবসময় কার্যকর হচ্ছে না।
সমস্যাপ্রবণ এলাকা : বিশেষ করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মশার ঘনত্ব দ্রুত বেড়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মিরপুর, পল্লবী, রমনা, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, রাজাবাজার ইত্যাদি এলাকা। এই এলাকাগুলোতে রাতে ও সন্ধ্যার পর মশার উপদ্রব প্রবল আকার ধারণ করে। অনেক পরিবার দরজা-জানালা বন্ধ করে বসলেও মশা ঢুকে পড়ায় দিনভর ঘুম, পড়াশোনা, অফিস কাজ সব কিছুই অশান্ত হয়ে পড়েছে।
কেন এমন ভয়াবহ বৃদ্ধি : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৬ সালের শীত অপেক্ষাকৃত স্বল্প ছিল এবং শীতের তাপমাত্রা মাত্র কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী ছিল। এর ফলে মশা ঝবধংড়হধষ বংশবৃদ্ধির পর্যায় দ্রুত পেরিয়ে গেছে এবং ঈঁষবী জাতের মশার সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠেছে।
নিষ্ক্রিয় মশা নিয়ন্ত্রণ : রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা সাম্প্রতিক নির্বাচনের সময় কিছু সময় ঢাকা দুই সিটি কর্পোরেশনের মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম কিছুটা শিথিল হয়ে পড়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করছেন। এর ফলে মশা বংশায়নের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।জলাবদ্ধতা ও নর্দমা বন্ধ থাকা : শহরের বেশ কিছু জায়গায় নর্দমা বা খাল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলে সেই স্থায়ী পানি মশার বংশবৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত স্থান তৈরি করছে। বিশুদ্ধ ও জৈব বর্জ্যে ভরা নর্দমা মশার প্রজনন জায়গা হওয়ায় মশা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
নগর প্রশাসনের পদক্ষেপ : রাজধানীর সিটি কর্পোরেশনগুলো জানাচ্ছে তারা মশা নিয়ন্ত্রণে পুনরায় উদ্যোগ নিচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) জানিয়েছেন, নির্বাচনের পর কিছুটা শিথিল হওয়া কার্যক্রম আবার ধাপে ধাপে শুরু করেছে। তারা মশার লার্ভা নিয়ন্ত্রণ এবং আবর্জনা পরিষ্কার করাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে নাগরিকদের অভিযোগ, এই কার্যক্রম পর্যাপ্ত নয় এবং দ্রুত ব্যবহারিক ফল দিচ্ছে না। কেউ কেউ বলছেন, মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মীরা খুব কম ফোগিং (মশা নিম্নকারী রসায়ন ছিটানো) করছে, আর আবর্জনা পরিষ্কার করার কাজও অসম্পূর্ণ।
স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক প্রভাব : মশার উপদ্রব শুধু অস্বস্তির কারণ নয় এটি স্বাস্থ্য ঝুঁকিও তৈরি করে। যদিও বর্তমানে এডিস জাতীয় ডেঙ্গু মশা তুলনামূলক কম পাওয়া যায় বলে কিছু রিপোর্ট বলছে, সমস্যা তৈরি করছে ঈঁষবী মশা যা রাতে মানুষের ওপর হামলা করে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া বা জ্বর-জ্বালা সংক্রান্ত রোগের ঝুঁকি কম থাকলেও বিপাকীয় বাধা ও বিরক্তির কারণে মানসিক চাপ বাড়ছে। এছাড়া ঘরবাড়ির মশারি, কয়েল ও স্প্রে ব্যবহার বেশি হওয়ায় গৃহস্থালি ব্যয়েরও বাড়তি চাপ পড়ছে।
নাগরিক প্রতিক্রিয়া : রাজধানীবাসীরা অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন যে মশার উপদ্রব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তারা রাতে ঘুমানোর আগে মশারি, কয়েলসহ মশা প্রতিরোধী সব দিকেই নির্ভর করতে হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, ‘ঘরেই থাকি, তবু মশা কামড় দেয়।’ আবার কেউ কেউ বলছেন, ‘দিনে-রাতে মশারি ছাড়া শান্তি নাই।’
রাজধানীর মাতুয়াইলের একজন ব্যবসায়ী আবদুর রহমান বলেন, অনেক শিশু রাতে ঘুমাতে ভয় পাচ্ছে বা মশার কামড়ে ঘুম বিঘ্ন হচ্ছে, ফলে পড়াশোনা ও কাজের কার্যক্ষমতাও কমেছে।