মো. নেয়ামত উল্যাহ
জুন ২১, ২০২৬, ১২:৩৭ এএম
একটি দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো তার নাগরিকদের নিরবচ্ছিন্ন খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বর্তমান বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে খাদ্য নিরাপত্তায় এক অভাবনীয় ও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে বাংলাদেশ।
দেশের সরকারি খাদ্য গুদামগুলোতে খাদ্যশস্যের মজুত এখন সামপ্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ ও স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে পৌঁছেছে। খাদ্য অধিদপ্তরের দৈনন্দিন খাদ্যশস্য পরিস্থিতি সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভাসমান (ফ্লোটিং) মজুতসহ দেশে খাদ্যশস্যের মোট সরকারি মজুতের পরিমাণ ২০ লাখ ৬০ হাজার ৫০৭ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে গেছে।
অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে চলতি মৌসুমে বাম্পার বোরো ধান-চাল সংগ্রহ এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত আমদানির যুগপৎ সাফল্যের কারণে এই ঐতিহাসিক ও পাহাড়সম মজুত গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি গুদামগুলোতে বর্তমানে প্রধান খাদ্যশস্য চালের মজুত রয়েছে প্রায় ১৫ লাখ ৯৬ হাজার মেট্রিক টন, গমের মজুত ৩ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন এবং ধানের মজুত ১ লাখ ৬১ হাজার মেট্রিক টনের ওপরে। খাদ্য নীতি ও পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশে সাধারণত ১৩ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন খাদ্যশস্য মজুত থাকলে তাকে ‘নিরাপদ মজুত’ হিসেবে গণ্য করা হয়। সেই হিসেবে বাংলাদেশ বর্তমানে ন্যূনতম নিরাপদ সীমার চেয়ে প্রায় ৭ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন বেশি খাদ্যশস্য উদ্বৃত্ত মজুত রাখতে সক্ষম হয়েছে।
নীতিনির্ধারক ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০ লাখ ৬০ হাজার টনের এই ঐতিহাসিক মজুত কেবল একটি সংখ্যা নয়; এটি দেশের কোটি কৃষকের শ্রমের ফসল এবং সরকারের সফল খাদ্য কূটনীতির এক বাস্তব প্রতিফলন। অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ প্রক্রিয়া স্বাভাবিক থাকায় এবং আমদানির পাইপলাইন সচল থাকায় বাজারে চাল ও গমের সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্থিতিশীল থাকবে।
এই উদ্বৃত্ত মজুত আগামী দিনে যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা এবং ওএমএস ও টিসিবির মতো সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী সচল রেখে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের জন্য এক দুর্ভেদ্য ঢাল হিসেবে কাজ করবে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে এনে দিয়েছে এক দীর্ঘমেয়াদি স্বস্তির সুবাতাস। খাদ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের খাদ্য গুদামগুলো এখন খাদ্যশস্যে পরিপূর্ণ। ফ্লোটিং (বা ভাসমান) এবং গুদামজাত মজুতের একটি নিখুঁত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো—
ক. গুদামজাত মূল মজুত (ফ্লোটিং বাদে)- প্রধান খাদ্যশস্য চাল: সরকারি গুদামগুলোতে বর্তমানে চালের মজুত রয়েছে ১৫ লাখ ৯৬ হাজার ৫৭ মেট্রিক টন। গম বা আটা: গমের মজুত রয়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৮৩১ মেট্রিক টন। ধানের মজুত: সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সংগৃহীত ধানের মজুত রয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৮৪ মেট্রিক টন। (উল্লেখ্য, কারিগরি নিয়ম অনুযায়ী ধানের এই পরিমাণকে চালের আকারে রূপান্তর করেই মোট হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করা হয়)। ফ্লোটিং বাদে মোট মজুত: ২০ লাখ ৩৮ হাজার ১১৪ মেট্রিক টন।
খ. ফ্লোটিং বা ভাসমান মজুত (যা খালাসের অপেক্ষায় বা ট্রানজিটে আছে)-
ভাসমান গম: ২০ হাজার ৪৩২ মেট্রিক টন। ভাসমান চাল: ১ হাজার ৯৬২ মেট্রিক টন।
গ. সর্বমোট সমন্বিত মজুত: গুদামজাত মূল মজুতের সাথে এই ভাসমান মজুত যুক্ত হয়ে দেশে এই মুহূর্তে সর্বমোট খাদ্যশস্যের মজুত দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ৬০ হাজার ৫০৭ মেট্রিক টনে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের খাদ্যশস্যের মজুত এই পাহাড়সম উচ্চতায় পৌঁছানোর প্রধানতম অনুঘটক হলো অভ্যন্তরীণ বোরো সংগ্রহ অভিযান। গত ৩ মে থেকে দেশব্যাপী এই সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে, যা আগামী ৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে চলবে।
১৭ জুন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সরকারি গুদামগুলো ইতোমধ্যে ৭ লাখ ১৮ হাজার ৩৭৩ মেট্রিক টন বোরো খাদ্যশস্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে।
খাতভিত্তিক বোরো সংগ্রহের পরিসংখ্যান— ধান সংগ্রহ: ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৭৫ মেট্রিক টন। (কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরাসরি মাঠপর্যায় থেকে এই ধান কেনা হয়েছে, যা চালের আকারে ১০০:৬৫ অনুপাতে মোট সংগ্রহে যোগ হয়েছে)। সিদ্ধ চাল: ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৬৭ মেট্রিক টন। আতপ চাল: ৩১ হাজার ৯৬৮ মেট্রিক টন। গম সংগ্রহ: ৪৯৪ মেট্রিক টন। চলতি মৌসুমে সরকারের মহাপরিকল্পনা ও লক্ষ্যমাত্রা— খাদ্য মন্ত্রণালয় চলতি বোরো মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অত্যন্ত আশাবাদী।
আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে সরকারের মোট সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ধান- ৫ লাখ মেট্রিক টন। চাল (সিদ্ধ)- ১২ লাখ মেট্রিক টন। আতপ চাল- ১ লাখ মেট্রিক টন। গম- ৫০ হাজার মেট্রিক টন। অভ্যন্তরীণ সংগ্রহের পাশাপাশি দেশের বাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে এবং ওএমএস ও টিসিবির মতো সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সচল রাখতে চলতি অর্থবছরে (১ জুলাই ২০২৫ থেকে ১৭ জুন ২০২৬ পর্যন্ত) সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে রেকর্ড পরিমাণ খাদ্যশস্য আমদানি করা হয়েছে। এই সময়ে মোট আমদানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৫ লাখ ৮৩ হাজার ৫১ মেট্রিক টন।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ শাখার উপ-সচিব মোহাম্মদ মামুন মিয়া বলেন, ‘১৩ লাখ ৫০ হাজার টন হলো আমাদের বেঞ্চমার্ক। সেই তুলনায় বর্তমানে আমাদের মজুত কেবল নিরাপদই নয়, বরং অত্যন্ত শক্তিশালী ও উদ্বৃত্ত পর্যায়ে রয়েছে। এটি যে কোনো আকস্মিক বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে শতভাগ ব্যাকআপ দেবে।’
খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. জামাল হোসেন বলেন, ‘সরকার দেশের মানুষের খাদ্য কষ্ট দূর করতে এবং পুষ্টি নিশ্চিত করতে যেসব লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে, তা বাস্তবায়নে আমরা মাঠপর্যায়ে নিরলসভবে কাজ করছি। বর্তমান সংগ্রহ অভিযান অত্যন্ত সফল।’
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা আগামী দিনগুলোর জন্য আরও বড় সুসংবাদ দিয়ে বলেন, ‘যেহেতু আমাদের বোরো সংগ্রহ অভিযান আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলমান থাকবে এবং নতুন ধান-চাল গুদামে আসা অব্যাহত রয়েছে, তাই আগামী দিনগুলোতে এই মজুতের গ্রাফ আরও ওপরের দিকে যাবে। আমদানির পাইপলাইন এবং অভ্যন্তরীণ সংগ্রহের এই চমৎকার সমন্বয়ের কারণে বাজারে চাল ও গমের সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্থিতিশীল থাকবে এবং কোনো কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির সুযোগ থাকবে না।’
২০২৬ সালের জুনের এই খাদ্য পরিস্থিতি প্রতিবেদন প্রমাণ করে যে, সঠিক পরিকল্পনা এবং সময়োচিত আমদানির সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কীভাবে একটি দেশ খাদ্য সংকটের বৈশ্বিক আশঙ্কাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে স্বস্তির চূড়ায় বসতে পারে। ২০ লাখ ৬০ হাজার টনের এই ঐতিহাসিক মজুত কেবল একটি সংখ্যা নয়; এটি দেশের কোটি কৃষকের শ্রমের ফসল এবং সরকারের সফল খাদ্য কূটনীতির এক বাস্তব প্রতিফলন।
অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ অভিযানের আর মাত্র আড়াই মাস বাকি থাকতেই দেশ যে নিরাপদ সীমার চেয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে, তা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য এক বিরাট স্বস্তির খবর। এই মজুত ধরে রাখতে পারলে এবং বাজার মনিটরিং জোরদার থাকলে আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে যে কোনো অস্থিরতা তৈরি হলেও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে খাদ্য সংকটে পড়তে হবে না যা একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি ও আত্মবিশ্বাসের উৎস।