ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬

খুলনায় কিশোরী গৃহকর্মী নির্যাতন: কাঠগড়ায় খোদ রক্ষক পুলিশ দম্পতি, তীব্র জনক্ষোভ

আমার সংবাদ ডেস্ক

আমার সংবাদ ডেস্ক

জুন ১৮, ২০২৬, ০২:১৭ পিএম

খুলনায় কিশোরী গৃহকর্মী নির্যাতন: কাঠগড়ায় খোদ রক্ষক পুলিশ দম্পতি, তীব্র জনক্ষোভ
গ্রেপ্তার হওয়া পুলিশ দম্পতি সঞ্জয় কুমার সাহা ও পরি রানী সাহা। ছবি: সংগৃহীত

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের কাঁধে, তাদের নিজেদের ঘরেই যদি চলে মধ্যযুগীয় বর্বরতা, তবে সাধারণ মানুষের ভরসার জায়গা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? এমনই এক মর্মস্পর্শী ও রোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে খুলনার সোনাডাঙ্গায়। এক কিশোরী গৃহকর্মীকে নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন এক পুলিশ দম্পতি। আইনের রক্ষক হয়েও ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া এই দম্পতির পৈশাচিকতায় স্তব্ধ হয়ে পড়েছে খুলনাসহ দেশবাসী।

বৃহস্পতিবার সকালে ভুক্তভোগী কিশোরীর মায়ের করা মামলার প্রেক্ষিতে ওই পুলিশ দম্পতিকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ।

গ্রেপ্তার হওয়া এই পুলিশ দম্পতি খুলনার সোনাডাঙ্গা থানায় কর্মরত। তারা হলেন, সহকারী উপ-পরিদর্শক বা এএসআই সঞ্জয় কুমার সাহা এবং সহকারী উপ-পরিদর্শক বা এএসআই পরি রানী সাহা। সম্পর্কে তারা স্বামী, স্ত্রী। তারা সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকার সোলার পার্ক সংলগ্ন একটি বহুতল ভবনের ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে বসবাস করতেন। আর সেখানেই গত পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে আসছিল ভুক্তভোগী অসহায় কিশোরীটি। দীর্ঘদিন ধরে ওই চার দেয়ালের ভেতরে কী ভয়াবহ নরক গুলজার চলছিল, তা বাইরের পৃথিবীর মানুষের অজানা ছিল। তবে বুধবার দুপুরে সেই নির্যাতনের মাত্রা সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে গেলে বিষয়টি প্রকাশ্য রূপ নেয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাতে জানা যায়, সোলার পার্ক সংলগ্ন ওই ভাড়া বাসাটি থেকে প্রায়শই কান্নাকাটি ও চিৎকারের শব্দ শোনা যেত। কিন্তু পুলিশের বাসা হওয়ায় সাধারণ মানুষ সহজে নাক গলাতে সাহস পাননি। তবে বুধবার দুপুরের ঘটনাটি ছিল অবর্ণনীয়। দুপুরের দিকে অভিযুক্ত দম্পতির ঘরের জানালা দিয়ে প্রতিবেশীরা দেখতে পান এক লোমহর্ষক দৃশ্য। কোনো একটি তুচ্ছ অজুহাতে ওই কিশোরীকে চুলার গরম কড়াই দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে এবং মুখে ছ্যাঁকা দেওয়া হচ্ছিল। কিশোরীটি যন্ত্রণায় ছটফট করছিল এবং মুখ সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তাতেও মন গলেনি পরি রানী সাহা কিংবা সঞ্জয় কুমার সাহার। উল্টো যন্ত্রণাকাতর মেয়েটিকে কান ধরে ওঠবস করতে বাধ্য করা হচ্ছিল। এই চরম অমানবিক ও নৃশংস দৃশ্য দেখে প্রতিবেশীদের পক্ষে আর চুপ থাকা সম্ভব হয়নি। ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন ও সোনাডাঙ্গা থানা পুলিশকে অবহিত করেন।

খবর পাওয়ার পর সোনাডাঙ্গা থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তারা ওই বাসা থেকে রক্তাক্ত ও দগ্ধ অবস্থায় কিশোরী গৃহকর্মীকে উদ্ধার করে। উদ্ধারের পর মেয়েটির অবস্থা এতটাই আশঙ্কাজনক ছিল যে, প্রথমে তাকে পুলিশ ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হলেও প্রাথমিক শুশ্রূষায় তার অবস্থার উন্নতি হয়নি। পরবর্তীতে তাকে দ্রুত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার বা ওসিসিতে ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, কিশোরীটির শরীরে পুরনো ও নতুন অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। বিশেষ করে গরম কড়াইয়ের ছ্যাঁকার কারণে শরীরের বেশ কিছু অংশ মারাত্মকভাবে দগ্ধ হয়েছে। বর্তমানে তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং ট্রমা থেকে বের করে আনার জন্য চিকিৎসকদের পাশাপাশি কাউন্সিলিংয়ের চেষ্টা চলছে।

মেয়ের ওপর দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে চলা এই পৈশাচিক নির্যাতনের খবর জানতেন না নরসিংদীতে বসবাসরত তার ভাগ্যবিড়ম্বিত মা মিনতি রানী। খবর পেয়েই তিনি আজ বৃহস্পতিবার ভোরে নরসিংদী থেকে দূরপাল্লার গাড়ি ধরে খুলনায় এসে পৌঁছান। সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় এসে মিনতি রানী বাদী হয়ে সঞ্জয় কুমার সাহা ও পরি রানী সাহার বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। 

থানায় দাঁড়িয়ে অশ্রুসজল চোখে মিনতি রানী বলেন, পেটের দায়ে, একটু ভালো থাকার আশায় মেয়েটাকে এই পুলিশের বাসায় কাজে দিয়েছিলাম। ভাবছিলাম পুলিশের বাসা, অন্তত নিরাপদে থাকবে। কিন্তু তারা মানুষ না, পশু! পাঁচ বছর ধরে আমার বাচ্চার ওপর এমন অত্যাচার চালিছে অথচ আমি কিছুই জানতাম না। আমি আর কিচ্ছু চাই না, আমার মেয়েকে সুস্থ অবস্থায় নিজের বুকে ফেরত চাই। আর এই নরপশুদের কঠিন বিচার চাই।

এই ন্যক্কারজনক ঘটনায় জেলা পুলিশ এবং সোনাডাঙ্গা থানা প্রশাসনের ভাবমূর্তি চরম সংকটে পড়েছে। সহকর্মীদের এমন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি খোদ পুলিশ বিভাগের জন্যই লজ্জাজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এই বিষয়ে সোনাডাঙ্গা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি মো. রফিকুল ইসলাম অত্যন্ত কড়া অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। 

তিনি সাংবাদিকদের জানান, ভুক্তভোগী কিশোরীর মায়ের এজাহারের ভিত্তিতে মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়েছে। মামলার পরপরই অভিযুক্ত এএসআই সঞ্জয় কুমার সাহা এবং এএসআই পরি রানী সাহাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আইনের চোখে কোনো অপরাধীই ছাড় পাবে না, সে পুলিশ হোক বা সাধারণ নাগরিক। ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ঘরের ভেতর এমন বর্বর নির্যাতনের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই নিন্দার ঝড় বইছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, যারা সমাজে আইন প্রয়োগ করবেন, সাধারণ মানুষের মানবাধিকার রক্ষা করবেন, তাদের মানসিকতাই যদি এমন অপরাধপ্রবণ হয়, তবে বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কোথায় থাকবে?

স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, গৃহকর্মী নির্যাতন প্রতিরোধে কঠোর আইন থাকলেও এর সঠিক প্রয়োগের অভাব রয়েছে। বিশেষ করে অপরাধী যদি প্রভাবশালী বা প্রশাসনের অংশ হয়, তবে ভুক্তভোগীরা আরও বেশি অসহায় হয়ে পড়ে। এই মামলায় যেন কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো না হয় এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে চার্জশিট গঠন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়, সেটাই এখন সুশীল সমাজের প্রধান দাবি।

কিশোরী গৃহকর্মীটি এখন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। তার ঝলসানো মুখ আর ক্ষতবিক্ষত শরীর যেন আমাদের সমাজের এক অন্ধকার দিককে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। এই পুলিশ দম্পতির বিচার শেষ পর্যন্ত কতটা দ্রুত এবং দৃষ্টান্তমূলক হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

জেএইচআর

Link copied!