নুসরাত জাহান (এ্যানি)
মে ১১, ২০২৬, ০৪:৩৬ পিএম
রাতভর টানা বৃষ্টির পর ভোরে ঘুম ভাঙতেই চারদিকে শুধু পানি আর পানি। উঠান ডুবে গেছে, রান্নাঘরে ঢুকছে স্রোত। বিছানার এক কোণে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে ছোট দুই সন্তান। মাথায় চালের বস্তা আর হাতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বের হন রোকেয়া বেগম। প্রতি বছর বর্ষা এলেই এমন আতঙ্কে দিন কাটে দেশের হাজারো পরিবারের।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। বর্ষা এলেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা দেয় বন্যা। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল, হাওর এলাকা ও নদী তীরবর্তী জেলাগুলোতে প্রতি বছরই লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু ও জীবিকা হারিয়ে মানবিক সংকট তৈরি হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগাম প্রস্তুতি নিলে বন্যার ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বন্যার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও সরকারি সতর্কবার্তার প্রতি নজর রাখা। টেলিভিশন, রেডিও, মোবাইল ফোন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য নিয়মিত অনুসরণ করলে মানুষ আগেভাগেই নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগ পায়। স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলাও জরুরি।
বন্যার সময় সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়ে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো। তাই আগাম শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধ, ম্যাচ, মোমবাতি ও টর্চলাইট সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। চাল, চিড়া, গুড়, বিস্কুট, স্যালাইন ও পানির বোতল কয়েকদিনের জন্য মজুত রাখা নিরাপদ। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র যেমন- জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, জমির কাগজ ও শিক্ষাসনদ পলিথিন বা জলরোধী ব্যাগে সংরক্ষণ করা উচিত।
গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় মানুষ নিজের জীবন বাঁচাতে পারলেও গবাদিপশু রক্ষা করতে পারে না। তাই আগেভাগেই উঁচু স্থানে পশু রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। স্থানীয়ভাবে আশ্রয়কেন্দ্রের পাশাপাশি পশুর জন্য আলাদা নিরাপদ জায়গা তৈরি করা প্রয়োজন।
বন্যার সময় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয়। দূষিত পানি পান করে ডায়রিয়া, জ্বর, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ে। তাই টিউবওয়েলের মুখ উঁচু করা, পানি ফুটিয়ে খাওয়া এবং পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করা জরুরি। শিশু ও বৃদ্ধদের প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে হবে।
এছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েও সতর্ক থাকতে হবে। অনেক সময় পানিতে ডুবে থাকা বৈদ্যুতিক তার বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই প্রয়োজন ছাড়া বিদ্যুৎ ব্যবহার না করা এবং বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখা উচিত। বন্যার সময় শিশুদের পানিতে খেলতে না দেওয়াও জরুরি, কারণ স্রোতের পানিতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে।
কৃষিখাতেও বন্যার প্রভাব ব্যাপক। কৃষকদের আগাম বীজ সংরক্ষণ, উঁচু জমিতে সবজি চাষ এবং মাছের ঘের সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে। অনেক এলাকায় এখন ভাসমান কৃষি পদ্ধতি জনপ্রিয় হচ্ছে, যা বন্যাকবলিত মানুষের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সরকারের ওপর নির্ভর না করে পরিবার ও সমাজভিত্তিক প্রস্তুতিও বাড়াতে হবে। স্থানীয় যুবক, স্বেচ্ছাসেবক ও সামাজিক সংগঠনগুলো বন্যার সময় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। স্কুল-কলেজে বন্যা মোকাবিলার প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানোরও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বন্যা একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও সচেতনতা, পরিকল্পনা ও সমন্বিত প্রস্তুতির মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। দুর্যোগের সময় আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সঠিক সিদ্ধান্ত ও মানবিক সহযোগিতা। কারণ আগাম প্রস্তুতিই পারে একটি পরিবার, এমনকি একটি জনপদকে বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে।
লেখক শিক্ষার্থী, স্নাতক (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষ গোপালগঞ্জ সরকারি কলেজ।
জেএইচআর