নিজস্ব প্রতিবেদক
নভেম্বর ২৮, ২০২৫, ০৫:১৯ পিএম
বাংলাদেশের মোবাইল ফোন বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই আইএমইআই ক্লোনিং নিয়ে নানা অভিযোগ থাকলেও সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য এটিকে আরও ভয়াবহ আকারে সামনে এনেছে। একটি মাত্র আইএমইআই নম্বরের বিপরীতে প্রায় দশ লাখ ফোন ব্যবহার হচ্ছে এমন তথ্য বৃহস্পতিবার ঢাকায় আয়োজিত এক সেমিনারে উপস্থাপন করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।
‘বৈধ ও নিরাপদ হ্যান্ডসেট ব্যবহারে এনইআইআরের গুরুত্ব’ শীর্ষক সেমিনারে অংশ নিয়ে বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আমিনুল হক বলেন, বাজারে বর্তমানে মাত্র পাঁচটি আইএমইআই নম্বরের বিপরীতে সচল আছে প্রায় ৫০ লাখ মোবাইলফোন। অর্থাৎ প্রতিটি নম্বরের পেছনে প্রায় ১০ লাখ করে হ্যান্ডসেট চলছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য এটি এক দৃষ্টান্তবিহীন নিরাপত্তাজনিত হুমকি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বক্তারা জানান, অবৈধ মোবাইল ব্যবসায়ীরা একই আইএমইআই নম্বর ক্লোন করে হাজার হাজার ফোন সক্রিয় করে দেশের বাজারে ছাড়ছে। এসব ফোন কোনোভাবে সরকারের ডেটাবেইসে ওঠে না, করও পাওয়া যায় না, পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য ব্যক্তি শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। আর্থিক প্রতারণা ও সাইবার অপরাধের অনেক ঘটনাই এই ধরনের অবৈধ ডিভাইস ব্যবহার করে সংঘটিত হয়, যার কারণে তদন্ত দীর্ঘায়িত হয় কিংবা ব্যাহত হয়।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমিনুল হক বলেন, ২০১৮ সালে এনইআইআর (ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্ট্রি) চালু করা হলে পরিস্থিতি এতটা জটিল হত না। দেরিতে শুরু হওয়ায় এখন নিয়মবহির্ভূত ফোনের পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
সেমিনারে জানানো হয়, দেশের চারটি মোবাইল নেটওয়ার্কে সচল থাকা আইফোনের সংখ্যা ১৯ লাখ ৭৬ হাজার। এর মধ্যে ১৯ লাখ ৫৫ হাজারই বৈধ আমদানির তালিকায় নেই। পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি সময়ে অবৈধ আইফোনের সংখ্যা ২১ লাখের কাছাকাছি পৌঁছতে পারে।
স্যামসাং ফোনেও একই চিত্র দেখা যায়। দেশে ব্যবহৃত ২ কোটি ৩১ লাখ স্যামসাং হ্যান্ডসেটের মধ্যে ১ কোটি ৪৯ লাখের বেশি ডিভাইস অবৈধ বলে চিহ্নিত হয়েছে। অর্থাৎ জনপ্রিয় ও দামি ফোনগুলোতেই ক্লোনিংয়ের ব্যবহার বেশি।
বিটিআরসির কমিশনার মাহমুদ হোসাইন বলেন, অবৈধ ফোন শনাক্ত হওয়ায় জনমনে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে তা অমূলক। কারণ নতুন এনইআইআর চালুর পরও আগে থেকে ব্যবহৃত সব ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধিত হয়ে যাবে এবং সচল থাকবে।
তিনি বলেন, ১৬ ডিসেম্বর থেকে এনইআইআর কার্যকর হবে। তবে যেসব ফোন ইতোমধ্যে নেটওয়ার্কে রয়েছে, সেগুলো বন্ধ হবে না। ভোক্তাকে উদ্বেগে থাকার কোনো কারণ নেই।
ফোনের দাম বাড়তে পারে এমন আশঙ্কা নিয়েও তিনি বলেন, বাজার নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে। কেউ সুযোগ নিতে চাইলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সেমিনারে উপস্থিত পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অতিরিক্ত ডিআইজি জাহিদুল ইসলাম মোবাইল পাচারের দিকটি তুলে ধরেন।
তিনি জানান, বাংলাদেশে ছিনতাই বা হারানো মোবাইল সীমান্তবর্তী চারটি পয়েন্ট—আখাউড়া, বটুলি, বেনাপোল ও দর্শনা—দিয়ে নিয়মিত পাচার হয়ে যায়। আবার ভারতের বিভিন্ন শহরে চুরি হওয়া ফোন উল্টো বাংলাদেশে ঢোকে। অর্থাৎ দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের ‘অবৈধ দ্বিতীয়হাত মোবাইল চক্র’ সক্রিয় রয়েছে।
তার মতে, পুরোনো যন্ত্রাংশ দিয়ে জোড়া লাগানো ফোন বা রিফারবিশড সেটের বাজার বড় হয়ে যাওয়ায় আসল মালিককে ফোন ফেরত দেওয়ার সুযোগ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে আইএমইআই নম্বর জালিয়াতি যুক্ত হওয়ায় সমস্যা আরও ঘনীভূত।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্মার্টফোনের বিস্তার যেমন সমাজে যোগাযোগ ও সেবার গতি বাড়িয়েছে, তেমনি অপরাধীরা প্রযুক্তির ফাঁকফোকর ব্যবহার করে নতুন ধরনের অপরাধের সুযোগ পাচ্ছে। আর আইএমইআই ক্লোনিং সেই অপরাধের অন্যতম সহজতম পদ্ধতি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেন, সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আধুনিক নজরদারি ও প্রযুক্তিভিত্তিক যাচাইপদ্ধতিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এনইআইআর চালু হলে অবৈধ ও নকল ফোন শনাক্ত দ্রুত হবে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করবে।
এনইআইআর সম্পর্কিত বিশেষজ্ঞদের ধারণা, অবৈধ ফোনের কারণে প্রতিবছর বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। বৈধ আমদানি ও কারখানার উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় মোবাইল শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে ফোন উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো বলছে, নকল ও চোরাচালানকৃত ফোনের বাজারে দাপট বৈধ উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
প্রযুক্তিবিদরা পরামর্শ দেন, নতুন ফোন কেনার সময় আইএমইআই নম্বর অবশ্যই যাচাই করতে হবে। ট্যাক্সপেইড বা এনআইআর নিবন্ধিত ফোন কিনতেই হবে। প্রয়োজনে অপারেটরের মাধ্যমে আইএমইআই স্ট্যাটাস যাচাই করা উচিত। হারানো ফোন দ্রুত থানায় জিডি করে আইএমইআই ব্লক করতে হবে।
ইএইচ