আমার সংবাদ ডেস্ক
মে ২৩, ২০২৬, ১০:১৬ এএম
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে চান বলে দাবি করেছেন আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা। তাঁদের ভাষ্য, মৃত্যুদণ্ডের রায় থাকা সত্ত্বেও তিনি দেশে ফিরতে প্রস্তুত এবং এ নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদেরও প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।
সম্প্রতি অনলাইন বৈঠক ও ব্যক্তিগত সাক্ষাতে শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেছেন- এমন কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা জানিয়েছেন, দলীয় প্রধান দেশে ফেরার বিষয়ে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছেন। তাঁরা বলছেন, শেখ হাসিনা চান দেশে ফিরে বিচার মোকাবিলা করতে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ এই বক্তব্যকে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার চেয়ে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই দেখছেন। তাঁদের মতে, আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সক্রিয় ও মনোবল ধরে রাখতেই এমন বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ভারত চলে যান। এরপর থেকেই তিনি সেখানে অবস্থান করছেন। এরই মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এক গণমাধ্যমকে বলেন, শেখ হাসিনা দ্রুত দেশে ফিরতে চান এবং সে অনুযায়ী দলীয় প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, “তিনি যেভাবে ভারত গিয়েছিলেন, সেভাবেই বীরদর্পে দেশে ফিরবেন।”
এটি কর্মীদের উজ্জীবিত রাখার কৌশল কি না-এমন প্রশ্নে নাছিম বলেন, “আরও কিছুদিন অপেক্ষা করুন। শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানাতে ব্যাপক জনসমাগমের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।”
তিনি আরও দাবি করেন, বর্তমান সময়ে মামলা ও নানা সংকটে থাকা দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্যই শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চান।
সম্প্রতি শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে দাবি করা ইউরোপ আওয়ামী লীগের এক নেতা জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে বিচারের সম্মুখীন হতে আগ্রহী। তিনি বলেন, বিষয়টি ভারত সরকারকেও অবহিত করা হয়েছে। এমনকি আগামী ১৫ আগস্টের আগেই দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাছে শেখ হাসিনা ট্রাভেল পাসের আবেদন করতে পারেন বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
ওই নেতা আরও জানান, দলের নেতাদের সঙ্গে টেলিগ্রামের এক গ্রুপ কলে শেখ হাসিনা বলেছেন, বয়সের কারণে তার হাতে হয়তো খুব বেশি সময় নেই। দেশে ফিরে গণতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে যদি ফাঁসির মঞ্চেও যেতে হয়, তাতেও তার আপত্তি নেই।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে শেখ হাসিনা ভারত যান বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। এরপর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। অনেকে দেশত্যাগ করেন, আবার অনেকেই আত্মগোপনে চলে যান।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের ২৭ অক্টোবর নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত করে। পরে চলতি বছরের এপ্রিলে জাতীয় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সংকট আরও গভীর হয়।
বর্তমানে তৃণমূল পর্যায়ের বহু নেতাকর্মী মামলা, গ্রেপ্তার আতঙ্ক ও আর্থিক সংকটে ভুগছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। এই পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বার্তাকে দল পুনর্গঠনের কৌশল হিসেবেও দেখছেন অনেকে।
দলীয় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারতে অবস্থান করলেও শেখ হাসিনা নিয়মিত নেতাকর্মীদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করছেন। ভারত সরকার তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সীমিত পরিসরে দলীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ করে দিচ্ছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের একটি সূত্র জানায়, মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করতে প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানককে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।
এদিকে বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার আইনগত প্রক্রিয়ায় শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়েছে। ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তির আওতায় তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
তবে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী মনে করেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বক্তব্য রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ভাষায়, “ক্ষমতায় থাকাকালে মুখের জোরে তিনি টিকে ছিলেন, এখনো সেই রাজনৈতিক ভাষার মাধ্যমেই কর্মীদের চাঙ্গা রাখতে চাইছেন। দেশে ফিরবেন- এমন বিশ্বাসযোগ্য কোনো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “তিনি ফিরতে চান কি না সেটি বড় বিষয় নয়। বরং সরকার যদি তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে চায়, তাহলে ফিরিয়ে আনার দায়িত্বও সরকারের।”
আওয়ামী লীগের নেতাদের ধারণা, শেখ হাসিনাকে নিরাপত্তাজনিত কারণে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। কিন্তু এখন দেশে একটি নির্বাচিত সরকার থাকায় তিনি ফিরলে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সংকট তেমন থাকবে না এবং আদালতে নিজের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ পাবেন।
একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে অসন্তোষ তৈরি করতে পারলে আওয়ামী লীগ আবারও রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে বলেও দলটির নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ মনে করছেন।
দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে যেসব মামলা মোকাবিলা করতে হতে পারে
গত বছরের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। রায়ে শেখ হাসিনাকে গণহত্যা, হত্যার নির্দেশ ও উসকানির দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ রায়ে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশও দেওয়া হয়।
বর্তমানে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং হত্যা-গুমসহ বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দমন, মানবতাবিরোধী অপরাধ, গুম-খুন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী তাজুল ইসলাম বলেন, দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে প্রথমেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করতে হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য মামলার বিচারও মোকাবিলা করতে হবে।
ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ আছে কি না- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, নির্ধারিত সময় ইতোমধ্যে অতিক্রম করেছে। এরপরও আপিল গ্রহণযোগ্য হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত সুপ্রিম কোর্ট নেবে।
তাজুল ইসলামের মতে, এতদিন বিচার প্রক্রিয়ায় অংশ না নিয়ে এখন দেশে ফিরে মামলা মোকাবিলার কথা বলা রাজনৈতিক অবস্থানও হতে পারে। তবে তিনি সত্যিই ফিরলে সেটি আইনি ও রাজনৈতিক- উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হবে।
সূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ
এএন