বিনোদন প্রতিবেদক
অক্টোবর ৩০, ২০২৫, ১১:৪০ এএম
বলিউডের রোমান্সের ইতিহাসে কিছু সিনেমা আছে, যেগুলো শুধু চলচ্চিত্র নয়—একটা অনুভূতি। যেগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে ভালোবাসার, বন্ধুত্বের আর সংগীতের মায়াবী জগতে টেনে নিয়ে যায়। তেমনই এক অনবদ্য সৃষ্টি—‘দিল তো পাগল হ্যায়’।
১৯৯৭ সালের ৩০ অক্টোবর মুক্তি পেয়েছিল এই সিনেমাটি, আজ পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ ২৮ বছর। তবু যেন গানগুলো, সংলাপগুলো, আর শাহরুখ খানের সেই প্রেমময় দৃষ্টি আজও হৃদয়ে বাজে নতুনের মতো। এই উপলক্ষে গতরাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স এ শাহরুখ খান ইউনিভার্স ফ্যান ক্লাব তাদের পেজে এক আবেগঘন পোস্ট দিয়েছে “২৮ বছর পূর্ণ ‘দিল তো পাগল হ্যায়’! প্রেম, সঙ্গীত ও বন্ধুত্বের গল্প—যা আজও অমলিন।” সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অসংখ্য হ্যাশট্যাগ: #ShahRukhKhan, #MadhuriDixit, #KarismaKapoor, #DTPH ইত্যাদি।
‘দিল তো পাগল হ্যায়’ পরিচালনা করেছিলেন বলিউডের কিংবদন্তি পরিচালক যশ চোপড়া। সিনেমার কেন্দ্রে তিনটি চরিত্র—রাহুল (শাহরুখ খান), পূজা (মাধুরী দীক্ষিত) ও নিশা (কারিশমা কাপুর)। তিনজনের বন্ধুত্ব, ভালোবাসা আর আত্মত্যাগের গল্পই সিনেমার প্রাণ।
এই ছবির সুরকার উত্তম সিং, আর গানের কথা লিখেছিলেন আনন্দ বক্সী। ‘Dil To Pagal Hai’, ‘Are Re Are’, ‘Bholi Si Surat’, ‘Koi Ladki Hai’—প্রতিটি গান আজও যেন ভালোবাসার প্রতীক। গায়ক লতা মঙ্গেশকর, উদিত নারায়ণ, হরিহরণ ও আশা ভোঁসলে–এর কণ্ঠে গানগুলো আজও শ্রোতাদের মুগ্ধ করে।
এই সিনেমার মূল আকর্ষণ ছিল তিন তারকার ত্রিভুজ প্রেম। শাহরুখের মিষ্টি হাসি, মাধুরীর সংযমিত অভিনয় আর কারিশমার প্রাণবন্ত উপস্থিতি দর্শকদের হৃদয় জয় করে নিয়েছিল। মাধুরী দীক্ষিত বলেছিলেন এক সাক্ষাৎকারে— “এই ছবিতে আমি যেমন চরিত্রে অভিনয় করেছি, তেমন মাধুরী আর কোনো ছবিতে ছিল না। রাহুল-পূজার সেই সম্পর্ক ছিল নিখাদ ভালোবাসা।”
কারিশমা কাপুর এই ছবির জন্য পান ফিল্মফেয়ার সেরা সহঅভিনেত্রীর পুরস্কার, আর শাহরুখ পান সেরা অভিনেতার মনোনয়ন। শুধু ভারত নয়, বিদেশেও এই সিনেমা তখন তুমুল জনপ্রিয়তা পায়।
‘দিল তো পাগল হ্যায়’ ১৯৯৭ সালের বলিউডে সর্বাধিক পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রগুলোর একটি। মোট ৮টি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জেতে এই সিনেমা। এর মধ্যে ছিল—সেরা চলচ্চিত্র (Best Film), সেরা পরিচালক (Yash Chopra), সেরা অভিনেত্রী (Madhuri Dixit), সেরা সহঅভিনেত্রী (Karisma Kapoor), সেরা সঙ্গীত পরিচালক (Uttam Singh) ও সেরা গীতিকার (Anand Bakshi)। এছাড়া সিনেমাটি ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারেও সেরা জনপ্রিয় চলচ্চিত্র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল।
‘দিল তো পাগল হ্যায়’ ছবির গানগুলো তখনকার প্রজন্মকে যেমন মাতিয়েছিল, আজও তার আবেদন অক্ষুণ্ণ। বিশেষ করে টাইটেল ট্র্যাক 'Dil To Pagal Hai, Dil Deewana Hai'—এখনও ভালোবাসার প্রতীক হয়ে আছে। ইউটিউবে গানটির ভিউ আজও কোটি ছাড়িয়ে গেছে, আর প্রতিটি মন্তব্যেই আছে '৯০–এর দশকের সেই নস্টালজিয়া'র ছোঁয়া।
সঙ্গীতপ্রেমীদের মতে, এই ছবির গানগুলো শুধুই সুর নয়, একেকটা আবেগ—যেখানে ভালোবাসা, একাকীত্ব আর বন্ধুত্ব একসাথে বেজে ওঠে।
‘দিল তো পাগল হ্যায়’ মুক্তির সময় শাহরুখ খান ইতিমধ্যেই ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে’-এর সাফল্যে রাজত্ব করছিলেন। কিন্তু এই ছবির মাধ্যমে তিনি রোমান্টিক নায়কের তকমাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। রাহুল চরিত্রে তার হাসি, দৃষ্টি ও সংলাপ—“Someone somewhere is made for you…” বলিউডের রোমান্সকে এক নতুন ভাষা দিয়েছিল। আজও শাহরুখ ভক্তরা এই সংলাপটি উদ্ধৃত করেন ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে।
প্রয়াত পরিচালক যশ চোপড়ার প্রতিটি সিনেমায় ছিল এক ধরনের রোমান্টিক দর্শন—ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না, শুধু রূপ বদলায়। ‘দিল তো পাগল হ্যায়’ সেই দর্শনেরই সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণ। চিত্রনাট্যের সরলতা, নাচ–গান ও ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক সবকিছুই দর্শকদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিল। চোপড়া একবার বলেছিলেন— “এই সিনেমা শুধু প্রেম নয়, বন্ধুত্বেরও গল্প। কারণ জীবনে সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্কগুলো বন্ধুত্ব থেকেই জন্ম নেয়।”
২৮ বছর পরও পৃথিবীর নানা দেশে এই সিনেমার জন্য উদ্যাপন হচ্ছে। শাহরুখ খানের ফ্যানক্লাব 'SRK Universe' এক্স–এ লিখেছে— “It’s not just a film; it’s an emotion. 28 years of timeless love!” হাজারো ভক্ত সেই পোস্টে ভালোবাসার মন্তব্যে ভরিয়ে দিয়েছেন। অনেকে লিখেছেন— “এই সিনেমা দেখে প্রেমে পড়েছিলাম, আজও সেটাই মনে আছে।”
সময় গড়িয়েছে, বলিউডের রোমান্টিক ছবির ধারা বদলেছে। তবু ‘দিল তো পাগল হ্যায়’ আজও এক অবিচ্ছেদ্য আবেগ। যশরাজ ফিল্মসের ব্যানারে নির্মিত এই সিনেমা শুধু এক যুগের প্রতীক নয়—এটি চিরন্তন প্রেমের সংজ্ঞা।
একজন ভক্ত যেমন মন্তব্য করেছেন— “যখনই ‘দিল তো পাগল হ্যায়’ দেখি, মনে হয় পৃথিবীটা আবার নতুন করে প্রেমে রঙিন হলো।”
‘দিল তো পাগল হ্যায়’ আজ ২৮ বছরে পা দিলেও, এর আবেগ আজও অমলিন। ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, প্রত্যাশা আর ত্যাগের এই গল্প প্রমাণ করেছে—সত্যিকারের প্রেম কখনো পুরোনো হয় না।
বলিউডে প্রেমের সিনেমা হয়তো অনেক হয়েছে, কিন্তু ‘দিল তো পাগল হ্যায়’ এখনো সেই একমাত্র সিনেমা—যা হৃদয়ের তারে সুর তোলে, আর মনে করিয়ে দেয়—হ্যাঁ, প্রেমে পড়া এখনো সুন্দর, কারণ—দিল তো আসলেই পাগল হ্যায়!
ইএইচ