হাশেম রেজা
ডিসেম্বর ৬, ২০২৫, ০১:০৬ পিএম
দেশের স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে গত কয়েক বছর ধরে এক গভীর মানসিক ও সামাজিক সংকট জন্ম নিচ্ছে। পরিবারে বাবা-মার স্নেহ-অনুরাগের ঘাটতি, শিক্ষকদের দিকনির্দেশনার অভাব এবং আধুনিক প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার মিলিয়ে ছোট বাচ্চাদের মনোজগতে তৈরি হচ্ছে এক অস্থিরতা। অষ্টম শ্রেণী বা নবম শ্রেণীর শিশুরা আজ আবেগের বন্যায় প্রেম-সম্পর্ক গড়ে তুলছে, যা তাদের বিভ্রান্ত করছে, লেখাপড়া থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ, আত্মঘাতী প্রবণতা কিংবা নেশার পরিবেশে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবার ও শিক্ষা-ব্যবস্থার ভাঙ্গন, সামাজিক নৈতিকতার শীতলতা এবং অনলাইন জগতের অযাচিত স্বাধীনতা মিলিয়ে শিশু-কিশোররা দ্রুত হারিয়ে ফেলছে আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। ফলে তারা কৈশোরের দুর্বল মুহূর্তে ভুল সম্পর্কের দিকে যাচ্ছে, অল্পতেই ভেঙে পড়ছে এবং জীবনের মূল লক্ষ্য-শিক্ষা-থেকে বিচ্যুত হচ্ছে।
ঢাকার একাধিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, এখন অষ্টম শ্রেণী হতে নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরাও সম্পর্ক, বিচ্ছেদ ও আবেগের ‘টানাপড়েন’ নিয়ে মানসিকভাবে চাপে থাকে। অনেকে বাড়িতে বাবা-মার সঙ্গে কথা বলে না, পড়াশোনা হয় না, সারাদিন মোবাইল-গেম-সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যস্ত থাকে। সেই ভার্চুয়াল জগতেই তাদের পরিচিতি, সম্পর্ক এবং আবেগের কেন্দ্র তৈরি হয়।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, শৈশবে বাবা-মার অতি ব্যস্ততা, সন্তানকে যথেষ্ট সময় না দেওয়া, স্নেহের ঘাটতি ও নিরাপত্তাহীনতা শিশুদের মনে এক শূন্যতা তৈরি করে। সেই শূন্যতা পূরণের জন্য তারা অল্প বয়সে প্রেম-সম্পর্ক বা আবেগিক নির্ভরতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। কোন কিছু ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা তখনও গড়ে ওঠেনি, ফলে তারা সহজেই আবেগে পরিচালিত হয়।
অন্যদিকে বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক পাঠদানেই মনোযোগী-তাদের কাছে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সমস্যা, মানসিক চাপ বা আবেগের পরিবর্তন খুব একটা গুরুত্ব পায় না। ফলে শিক্ষার্থীরা দিকহারা হয়ে ওঠে।
সমস্যাটি শুধুমাত্র স্কুলে সীমিত নয়। এমনকি কলেজে ভর্তি হওয়ার পরও অনেক তরুণ-তরুণীর জীবন একই ধারায় এগোয়। নতুন পরিবেশ, স্বাধীনতা, নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ-এসব মিলিয়ে আবেগের ঝড় আরও জোরালোভাবে আঘাত হানে। অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে; একসময়ের মেধাবী ছাত্র বা ছাত্রীও সম্পর্ক-নেশা-বিভ্রান্তির জালে জড়িয়ে পড়ে।
বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর যেসব শিক্ষার্থী পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ কম রাখে, যারা মানসিকভাবে একা অনুভব করে বা ভুল সম্পর্কের অভিজ্ঞতায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তাদের মধ্যে নেশা, ধূমপান, রাতভর মোবাইল ব্যবহার, শিক্ষাজীবন থেকে বিচ্যুতি এসব প্রবণতা দ্রুত বাড়ে।
বিশেষত কিছু তরুণী অভিজ্ঞতার অভাবে, আবেগের তাড়নায় ও 'বিশ্বাস' এর ভুল ব্যাখ্যায় অনেক সময় নিজের সুরক্ষাজনিত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও ভুলভাবে নেয়। পরে প্রতারণা, পারিবারিক চাপ, সামাজিক লজ্জা এবং মানসিক সংকট তাদের পুরো জীবনকে থামিয়ে দেয়।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতের জাতি গঠনের প্রক্রিয়া বিপন্ন হবে। একটি দেশের তরুণ সমাজই তার সবচেয়ে বড় সম্পদ। কিন্তু তারা যদি কৈশোর থেকেই ভুল দিকনির্দেশনা, নেশা, সম্পর্কজনিত চাপ, হতাশা ও মানসিক বিশৃঙ্খলায় ভোগে, তবে তাদের মেধাশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সৃজনশীলতা কমে যাবে, এবং শিক্ষা-মান নিম্নমুখী হবে।
তাদের মতে, একজন শিক্ষার্থীকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ করার চেষ্টা করলেই চলবে না; বরং ছোটবেলা থেকেই তাদের সঠিক পরিবেশ, সুস্থ বন্ধুত্ব, অভিভাবকসুলভ ভালোবাসা এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে দেওয়া জরুরি। না হলে পরিবার-সমাজ মিলে যতই নিয়ম বানানো হোক, উন্নতি আসবে না।
বাবা-মার ভূমিকা: সন্তানের প্রথম বিদ্যালয় পরিবার প্রতিদিন সন্তানকে অন্তত ৩০-৪৫ মিনিট সময় দিতে হবে। সন্তানের সমস্যার কথা শুনতে হবে বকাঝকা নয়, বোঝানোর ভাষায়। মোবাইল ব্যবহারের নিয়ম তৈরি করতে হবে, নজরদারি নয় দায়িত্বশীলতা শেখাতে হবে। ছোট থেকেই মূল্যবোধ, আত্মসম্মান, আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখাতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে কিন্তু অতিরিক্ত সন্দেহ বা কঠোরতা দেখানো যাবে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সন্তান যদি বাড়িতে ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও বোঝাপড়ার পরিবেশ পায়, তবে সে আবেগিক দুর্বলতায় ভুল সম্পর্কে জড়াবে না।
শিক্ষক-প্রফেসরদের ভূমিকা: পাঠদান নয়, দিকনির্দেশনা জরুরি। বিদ্যালয়-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। শিক্ষার্থীর মানসিক পরিবর্তন নজরে রাখা, পরামর্শ ক্লাস বা মেন্টরিং সেশন চালু করা, প্রেম-নেশা-ব্যবহারগত সমস্যা নিয়ে সচেতনতামূলক ক্লাস, শিক্ষার্থীর আচার-আচরণ বা পতন লক্ষ্য করলে অভিভাবকের সঙ্গে আলোচনায় বসা, মূল্যবোধ, জীবনদর্শন, আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার মতো বক্তৃতা ও আলোচনা।
একজন শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীর জীবনে দায়িত্বশীল অভিভাবকের মতো ভূমিকা রাখেন, তবে শিক্ষার্থীরা বিপথে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মনোরোগ-পরামর্শ কেন্দ্রে বিনিয়োগ জরুরি: বিশ্বের অনেক দেশে স্কুল-কলেজে ‘স্টুডেন্ট কাউন্সেলর’ বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশেও প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মনোসামাজিক সহায়তা সেল থাকা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা যেন নিজের সমস্যা ‘ নিরাপদে’ বলতে পারে। প্রেম-বিচ্ছেদ-নেশা-পরিবারিক ঝামেলা নিয়ে কাউন্সেলিং। এ ধরনের সাহায্য থাকলে অনেক আত্মঘাতী ঘটনা, বাল্যবিবাহ বা বিপথগামীতা রোধ করা সম্ভব।
সামাজিক সচেতনতা: নেশা থেকে বাঁচাতে যৌথ উদ্যোগ নেশা শুধু ব্যক্তি নয়, সমাজকে ধ্বংস করে। তাই এলাকায় নেশা-বিরোধী সচেতনতা সভা, কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে কমিউনিটির ভূমিকা, বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বাড়ানো, যেখানে খেলাধুলা বেশি, সেসব এলাকায় নেশাগ্রস্ততা কম দেখা যায়।
প্রতিটি মা-বাবাকে বুঝতে হবে, সন্তান স্বাভাবিকভাবে ভুল করবে। কিশোর বয়সেই মানবজীবনের সবচেয়ে বড় ভুলগুলো হয়। কিন্তু সে ভুল থেকে ফিরিয়ে আনতে অভিভাবক ও শিক্ষকদের স্নেহমিশ্রিত দৃঢ় ভূমিকা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। সন্তানকে ‘দমিয়ে’ নয়, বরং 'বুঝিয়ে' সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা যায়।
স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত তরুণদের মধ্যে আবেগিক অস্থিরতা, প্রেম-বিভ্রান্তি ও নেশার প্রবণতা একটি জাতীয় সংকটে পরিণত হচ্ছে। বাবা-মার ভালোবাসার অভাব, শিক্ষকদের উদাসীনতা, ইন্টারনেটের অতিরিক্ত প্রভাব, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়-সবকিছু মিলিয়ে কিশোর-যুবপ্রজন্ম একটি অদৃশ্য জালে আটকে পড়ছে।
এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে পরিবার-বিদ্যালয়-সমাজ-সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ছোট থেকেই সন্তানকে নৈতিকতা, নিয়ন্ত্রণ, মূল্যবোধ, আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস শেখাতে হবে। না হলে আগামী প্রজন্ম শুধু শিক্ষায় পিছিয়ে পড়বে না, হারিয়ে ফেলবে তাদের মেধা, শক্তি ও জীবনের মূল লক্ষ্য।
একটি জাতিকে ধ্বংস করতে সবচেয়ে বেশি সময় লাগে না; শুধু তার তরুণ সমাজকে বিপথে যেতে দিলেই যথেষ্ট। এখনই তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়ার সময়।
জেএইচআর